তরুণ প্রজন্ম, রাষ্ট্র ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা - Bangladesh HR Defender | Human Rights, Rule of Law & Accountability

Latest

Thursday, December 18, 2025

তরুণ প্রজন্ম, রাষ্ট্র ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা



ভারত ও বাংলাদেশের ভিন্ন পথচলার একাডেমিক ও মানবিক বিশ্লেষণ

একবিংশ শতাব্দীর বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা ক্রমশ জ্ঞান, দক্ষতা ও উদ্ভাবননির্ভর হয়ে উঠছে, যেখানে রাষ্ট্রের সক্ষমতা নির্ধারিত হয় তার তরুণ প্রজন্ম কতটা কার্যকর মানবসম্পদে রূপান্তরিত হতে পারছে তার ওপর। এই প্রবন্ধে ভারত ও বাংলাদেশের তরুণ সমাজের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় অবস্থান তুলনামূলকভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। মানবসম্পদ তত্ত্ব, নাগরিক স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক পরিবেশের আলোকে গবেষণাটি দেখায়—ভারতের তরুণরা প্রতিযোগিতামুখী শিক্ষা, তুলনামূলকভাবে উন্মুক্ত চিন্তার পরিসর এবং বৈশ্বিক সংযোগের মাধ্যমে বিশ্ববাজারে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করেছে। বিপরীতে, বাংলাদেশের তরুণ সমাজ রাজনৈতিক দখলদারত্ব, ভয়ের সংস্কৃতি, রাজনীতিকৃত শিক্ষা ও সংকুচিত নাগরিক পরিসরের কারণে তাদের সম্ভাবনার পূর্ণ বিকাশে ব্যর্থ হচ্ছে। প্রবন্ধটি যুক্তি দেয় যে তরুণদের দমন নয়, বরং তাদের সক্ষমতায় বিনিয়োগই রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি টিকে থাকার প্রধান শর্ত।


১. ভূমিকা

রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ কেবল তার প্রাকৃতিক সম্পদ বা সামরিক শক্তির ওপর নির্ভর করে না; বরং নির্ভর করে তার তরুণ প্রজন্ম কতটা চিন্তাশীল, দক্ষ ও বৈশ্বিকভাবে প্রতিযোগিতায় সক্ষম হয়ে উঠতে পারে তার ওপর। বিশ্বায়নের এই যুগে তরুণরা আর কেবল জাতীয় নাগরিক নয়—তারা একই সঙ্গে বৈশ্বিক শ্রমবাজার ও জ্ঞানভিত্তিক সমাজের অংশ।

দক্ষিণ এশিয়ার দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্র—ভারত ও বাংলাদেশ—প্রায় একই উপনিবেশিক ইতিহাস ও জনসংখ্যাগত সুবিধা থাকা সত্ত্বেও তরুণ সমাজের বৈশ্বিক অবস্থানে স্পষ্ট পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। এই প্রবন্ধের মূল প্রশ্ন হলো:

কেন ভারতীয় তরুণরা বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যাচ্ছে, আর কেন বাংলাদেশের তরুণ সমাজ ক্রমশ পিছিয়ে পড়ছে?

২. তাত্ত্বিক কাঠামো (Theoretical Framework)

২.১ মানবসম্পদ তত্ত্ব (Human Capital Theory)

মানবসম্পদ তত্ত্ব অনুযায়ী শিক্ষা, দক্ষতা ও স্বাস্থ্য বিনিয়োগ ব্যক্তির উৎপাদনশীলতা ও রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়ায় (Becker, 1993)। তবে আধুনিক গবেষণা দেখায়, এই বিনিয়োগ কার্যকর হয় তখনই, যখন রাজনৈতিক ও নাগরিক পরিবেশ সহায়ক থাকে।

২.২ স্বাধীনতা ও উন্নয়ন

অমর্ত্য সেন (1999) যুক্তি দেন, উন্নয়ন কেবল আয় বৃদ্ধির বিষয় নয়; বরং এটি মানুষের স্বাধীনতা সম্প্রসারণের প্রক্রিয়া। মতপ্রকাশ ও চিন্তার স্বাধীনতা না থাকলে মানবসম্পদের বিকাশ স্থবির হয়ে পড়ে।

৩. গবেষণা পদ্ধতি (Methodology)

এই গবেষণায় গুণগত তুলনামূলক বিশ্লেষণ (Qualitative Comparative Analysis) পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়েছে। এতে অন্তর্ভুক্ত—

  • আন্তর্জাতিক সূচক (Freedom House, V-Dem, UNDP)

  • একাডেমিক সাহিত্য পর্যালোচনা

  • ভারত ও বাংলাদেশের শিক্ষা ও রাজনৈতিক পরিবেশের তুলনা

৪. ভারতীয় তরুণ সমাজ: প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে সক্ষমতা অর্জন

ভারতের শিক্ষা ও কর্মব্যবস্থা অত্যন্ত প্রতিযোগিতামুখী। IIT, IIM ও AIIMS-এর মতো প্রতিষ্ঠান তরুণদের মধ্যে সমস্যা সমাধান, গবেষণা ও বৈশ্বিক মানদণ্ডে দক্ষতা গড়ে তুলেছে। ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা ও শক্তিশালী প্রবাসী নেটওয়ার্ক ভারতীয় তরুণদের বৈশ্বিক শ্রমবাজারে গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে (Kapur, 2010)।

যদিও বৈষম্য রয়েছে, তবুও ভারত রাষ্ট্রীয়ভাবে তরুণদের বিশ্বমুখী হওয়ার পথ রুদ্ধ করেনি; বরং তা অনেকাংশে উৎসাহিত করেছে।

৫. বাংলাদেশের তরুণ সমাজ: সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও পশ্চাৎপদতা

বাংলাদেশের তরুণ সমাজের সবচেয়ে বড় সমস্যা মেধার অভাব নয়; বরং কাঠামোগত প্রতিবন্ধকতা।

৫.১ রাজনীতিকৃত শিক্ষা ও ক্যাম্পাস

বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো জ্ঞানচর্চার কেন্দ্রের বদলে রাজনৈতিক দখলদারত্বের এলাকায় পরিণত হয়েছে। এতে সমালোচনামূলক চিন্তা ও গবেষণা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

৫.২ ভয়ের সংস্কৃতি ও নাগরিক পরিসরের সংকোচন

মতপ্রকাশের ঝুঁকি, ডিজিটাল নজরদারি ও প্রশাসনিক চাপ তরুণদের মধ্যে আত্মনিয়ন্ত্রণ (self-censorship) তৈরি করেছে (Freedom House, 2024)।

৫.৩ সনদ আছে, দক্ষতা নেই

শিক্ষা ব্যবস্থায় গবেষণা ও বৈশ্বিক দক্ষতার ঘাটতির কারণে বহু গ্র্যাজুয়েট আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অপ্রস্তুত থেকে যাচ্ছে।

৬. মানবিক বিশ্লেষণ: হারিয়ে যাওয়া সম্ভাবনা

যখন এক দেশের তরুণ গবেষণাগারে কাজ করে, অন্য দেশের তরুণ তখন রাজনৈতিক আনুগত্য রক্ষায় সময় ব্যয় করে। এটি ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়; এটি রাষ্ট্রীয় নীতির ফল। তরুণদের ভয় দেখিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা যায়, কিন্তু সক্ষমতা তৈরি করা যায় না।

৭. নীতিগত ও কাঠামোগত প্রস্তাবনা

বাংলাদেশের জন্য প্রয়োজন—

  • শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে রাজনীতিমুক্ত করা

  • মুক্ত চিন্তা ও গবেষণার নিরাপদ পরিবেশ

  • দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা সংস্কার

  • তরুণদের মানবসম্পদ হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি

৮. উপসংহার (Conclusion)

ভারত ও বাংলাদেশের তরুণ সমাজের ভিন্ন পথচলা প্রমাণ করে—রাষ্ট্র তরুণদের সঙ্গে যেমন আচরণ করে, ভবিষ্যৎও তেমনই গড়ে ওঠে। তরুণদের দমন নয়, তাদের সক্ষমতায় বিনিয়োগই রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি টিকে থাকার একমাত্র বাস্তব পথ।

তথ্যসূত্র (References)

Becker, G. S. (1993). Human capital: A theoretical and empirical analysis, with special reference to education (3rd ed.). University of Chicago Press.

Freedom House. (2024). Freedom in the world 2024: Bangladesh. https://freedomhouse.org

Kapur, D. (2010). Diaspora, development, and democracy: The domestic impact of international migration from India. Princeton University Press.

Sen, A. (1999). Development as freedom. Oxford University Press.

UNDP. (2023). Human Development Report 2023–24. United Nations Development Programme.

V-Dem Institute. (2023). Democracy Report 2023. University of Gothenburg.

Presented by-
Minhaz Samad Chowdhury
Independent Human Rights Defender
🌐 https://hr-defender.blogspot.com
Focus: State Violence • Political Rights • Religious Minority Rights • Democratic Accountability in Bangladesh

No comments:

Post a Comment

Please validate CAPTCHA