সিলিংয়ের সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখা: রাষ্ট্রীয় নির্যাতন, দায়মুক্তির সংস্কৃতি এবং বাংলাদেশে ওপিস্যাট জরুরি
একটি সিলিং, কয়েক ফুট রশি আর রাষ্ট্রের নামে পরিচালিত গোপন আটককেন্দ্র — বাংলাদেশের সামরিক-গোয়েন্দা ইতিহাসের এক কলঙ্কজনক অধ্যায় আজ নতুন করে উঠে এসেছে অনুসন্ধানে। ২০০৭ সালের ৭ মার্চ তারেক রহমানকে ক্যান্টনমেন্টের বাসা থেকে নির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ ছাড়া গ্রেপ্তার করে ডিজিএফআই’র জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেলে (জেআইসি) নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা চোখ বাঁধা, হাত বাঁধা অবস্থায় সিলিংয়ের সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখা হয়। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এটিএম আমিনের প্রত্যক্ষ নির্দেশে ‘পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত ঝুলন্ত’ রাখার নির্দেশ দেয়া হয়। একপর্যায়ে তিনি সিলিং থেকে পড়ে যান এবং কোমরে গুরুতর আঘাত পান। এই প্রতিবেদন মানবাধিকার বিশ্লেষণ করে: কীভাবে রাষ্ট্রীয় অঙ্গ নির্যাতনের হাতিয়ার হয়ে ওঠে, এবং ভবিষ্যতে এমন নৃশংসতা বন্ধে কোন কাঠামোগত সংস্কার অনিবার্য।
১. আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কাঠামো: কোন অধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে?
বাংলাদেশ ১৯৯৮ সালে জাতিসংঘের নির্যাতনবিরোধী কনভেনশন (UNCAT) এবং ২০০০ সালে আইসিসিপিআর (ICCPR) অনুমোদন করেছে। তারপরও ডিজিএফআই জেআইসির মতো অপারেটিং সেলে নির্যাতন অব্যাহত ছিল — যা প্রত্যক্ষ লঙ্ঘন। নিচের সারণি অনুসারে নির্যাতনের প্রতিটি পর্যায় মানবাধিকার চুক্তির পরিপন্থী:
সেই সাথে নির্যাতনের ফলে তারেক রহমান খুঁড়িয়ে হাঁটছিলেন — জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী প্রত্যক্ষ করেছিলেন। নির্যাতনের দীর্ঘমেয়াদী শারীরিক ও মানসিক পরিণতি আজও বহাল। রাষ্ট্র তা স্বীকার করেনি, ক্ষতিপূরণ দেয়নি।
২. রাষ্ট্রীয় অঙ্গ ও দায়মুক্তির স্থাপত্য
অনুসন্ধানে নিশ্চিত হয়েছে, সাতজন সেনা কর্মকর্তা নির্যাতনের সময় উপস্থিত ছিলেন। তারা বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ — সামরিক বাহিনী, ডিজিএফআই এবং সিটিআইবি। তালিকায় রয়েছেন:
কমান্ড রেসপনসিবিলিটি (UNCAT Art. 2(3) ও রোম সংবিধি ২৮) অনুযায়ী, উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা নির্যাতন রুখতে ব্যর্থ হলে অথবা নির্দেশ দিলে অপরাধী হন। এখানে সেনাপ্রধান জেনারেল মঈন উ আহমেদ ও ব্রিগেডিয়ার এটিএম আমিনের ভূমিকা রয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, আর্মি হেডকোয়ার্টারেই গ্রেপ্তারের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
৩. প্রতিরোধমূলক পথচিহ্ন: কেন ওপিস্যাট (OPCAT) অপরিহার্য?
নির্যাতনের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে বিধ্বংসী প্রেসক্রিপশন একটিঃ OPCAT (নির্যাতনবিরোধী কনভেনশনের ঐচ্ছিক প্রটোকল) অনুমোদন ও জাতীয় প্রতিরোধক প্রক্রিয়া (NPM) বাস্তবায়ন। ওপিস্যাটের অধীনে একটি স্বাধীন সংস্থা হঠাৎ এসে যে কোনো আটক কেন্দ্র — ডিজিএফআই সেল, সিটিআইবির জেআইসি, সামরিক পুলিশ — পরিদর্শন করতে পারে। বাংলাদেশ এখনো OPCAT স্বাক্ষর করেনি। সেই জায়গা থেকেই দীর্ঘস্থায়ী দায়মুক্তির জন্ম।
২০২৬ সালের এই উদ্ঘাটন প্রমাণ করে: গোপন আটককেন্দ্রের দরজা বন্ধ করতে হবে, সাংবিধানিক ও আইনি কাঠামো তৈরি করতে হবে। নিম্নে দশটি বাধ্যতামূলক সংস্কার প্রস্তাব:
📌 পالیসি সুপারিশ: ’সিলিং অফ ইমপিউনিটি’ ভাঙতে
- স্বতন্ত্র নির্যাতনবিরোধী আইন — ইউএনসিএটির সংজ্ঞা অনুযায়ী অপরাধীকরণ, সর্বনিম্ন ১০ বছর কারাদণ্ড, ‘উর্ধ্বতন আদেশ’ প্রতিরক্ষা নয়।
- অবিলম্বে OPCAT অনুমোদন ও জাতীয় প্রতিরোধক ব্যবস্থা গঠন, গোয়েন্তা সেলে অনুর্ধ্বিত পরিদর্শন নিশ্চিতকরণ।
- ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ম্যাজিস্ট্রেটের সম্মুখে হাজির করাকে বাধ্যতামূলক করা, কোনো ব্যতিক্রম নয় (ভারপ্রাপ্ত সেনা অফিসার নয়)।
- সকল জিজ্ঞাসাবাদের পূর্ণ ভিডিও রেকর্ডিং, দশ বছর সংরক্ষণ; ‘টেকনিক্যাল সমস্যা’ নির্যাতনের অনুমান তৈরি করবে।
- স্বতন্ত্র ফরেনসিক মেডিকেল বোর্ড — গ্রেপ্তারের ১২ ঘণ্টার মধ্যে নিরপেক্ষ চিকিৎসক দ্বারা পরীক্ষা বাধ্যতামূলক।
- অনলাইন আটক নিবন্ধন — প্রতিটি আটক ব্যক্তির নাম ও স্থান সরকারি ওয়েবসাইটে প্রকাশ, ‘ভূত আটক’ বন্ধ হবে।
- সত্য ও জবাবদিহিতা কমিশন — ২০০১-২০০৯ সময়ের নির্যাতন, জোরপূর্বক গায়েব ও নির্বাসন তদন্ত করবে; অভিযোগ গঠনের ক্ষমতা থাকবে।
- জোরপূর্বক নির্বাসনে বাধ্য তারেক রহমানসহ সব নির্যাতিতের জন্য পূর্ণ পুনর্বাসন (UNCAT ধারা ১৪)।
- আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য বাধ্যতামূলক মানবাধিকার প্রশিক্ষণ (প্রোমোশনের পূর্বশর্ত) — নির্যাতনের নৃশংস বাস্তবতা তুলে ধরা।
- জাতীয় সংসদে নির্যাতনবিরোধী বিল দ্রুত পাস ও একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি গঠন যাতে বিচার বিভাগীয় পর্যবেক্ষণ থাকে।
৪. “সে সময় সে খুঁড়িয়ে হাঁটছিল” — স্বীকারোক্তি ও নিরাময়ের অনুপস্থিতি
জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী তার জবানবন্দিতে বলেন, ২০০৮ সালের জানুয়ারিতে তারেক রহমান প্যারোলে মুক্তি পাওয়ার পর তিনি তাকে দেখেন “খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছে”। তিনি ডিজিএফআইয়ের কর্মকর্তাদের নির্যাতনের কথা শুনে সেনাপ্রধান জেনারেল মঈনের কাছে প্রতিবাদ করলে ‘বাগ্বিতণ্ডা’ হয়। এটি প্রমাণ করে: উপরের স্তরটি নির্যাতনের ঘটনা সম্পর্কে পূর্ণ জ্ঞাত ছিল, কিন্তু আইনি ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। অপারেশন ক্লিন হার্টের প্রেক্ষাপট ব্যবহার করে তৎকালীন শাসকগোষ্ঠী নির্যাতনকে ‘নিরাপত্তা ব্যবস্থা’ বলে চালিয়ে দেয়।
মানবাধিকার রক্ষকের দৃষ্টিতে, প্রতিটি সিলিংয়ের গল্প একই সুরে বাজে: রাষ্ট্র যখন নিজের নাগরিককে নিঃশব্দে নির্যাতন করে, তখন গণতন্ত্র ও আইনের শাসন কেবালে পরিণত হয়। তারেক রহমান আজ রাষ্ট্রক্ষমতায় রয়েছেন — কিন্তু বিষয়টি ব্যক্তির রাজনৈতিক অবস্থান উপেক্ষা করে শুধু নীতি ও প্রতিরোধের। যে রাষ্ট্র কখনো সিলিং ঝুলিয়ে নির্যাতন করেছে, সেই রাষ্ট্র যদি প্রকৃত মানবাধিকার রক্ষক হতে চায় তাহলে বাধ্যতামূলকভাবে অতীতের বিচার প্রক্রিয়া ও ওপিস্যাট বাস্তবায়ন করতে হবে।
৫. উপসংহার: দায়মুক্তির ছাদ ভেঙে ফেলতে হবে
২০০৭ সালের নির্যাতন কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয় — এটি পদ্ধতিগত ব্যর্থতার ফল। গোয়েন্দা সংস্থাগুলো আইনের চোখ এড়িয়ে জোরপূর্বক স্বীকারোক্তি ও নির্বাসনকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। যতদিন OPCAT অনুমোদন না হবে, ততদিন যেকোনো সরকার ক্ষমতায় গিয়ে গোপন আটককেন্দ্রে নির্যাতনের পুনরাবৃত্তি ঘটাতে পারে। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে শক্তিশালী করা, অ্যান্টি-টর্চার আইন প্রণয়ন, এবং ২০২৬ সালের এই অনুসন্ধানের ভিত্তিতে বিচারিক তদন্ত শুরু করা জরুরি। লেখক হিসেবে আমি দাবি জানাই: নির্মম সিলিংয়ের সেই দৃশ্য আর কখনো যেন বাংলাদেশের কোনো নাগরিককে না স্পর্শ করে — তার জন্য আজই সিলিং অফ ইমপিউনিটি ভাঙতে হবে।

No comments:
Post a Comment
Please validate CAPTCHA