বাংলাদেশে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মব ভায়োলেন্স বা ভিড়ের সহিংসতা বিচ্ছিন্ন সামাজিক ঘটনার গণ্ডি পেরিয়ে একটি কাঠামোগত সংকটে রূপ নিয়েছে। দুর্বল আইন প্রয়োগ, বিচারহীনতার সংস্কৃতি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজবের দ্রুত বিস্তার এবং রাজনৈতিক মেরুকরণ—এই উপাদানগুলো সম্মিলিতভাবে ভিজিল্যান্টে জাস্টিসকে সামাজিকভাবে স্বাভাবিক করে তুলেছে। মানবাধিকার সংস্থার তথ্য অনুযায়ী ২০২৪–২০২৫ সময়ে শত শত মানুষ মব সহিংসতায় প্রাণ হারিয়েছেন। ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক ও মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদীর মৃত্যু এই সহিংস বাস্তবতার প্রতীকী বহিঃপ্রকাশ, যেখানে রাজনৈতিক সক্রিয়তা ও নাগরিক অংশগ্রহণ ক্রমশ জীবনঝুঁকির বিষয় হয়ে উঠছে। এই প্রবন্ধে বাংলাদেশে মব ভায়োলেন্সের পরিসংখ্যানগত প্রবণতা, কাঠামোগত কারণ এবং মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের ওপর এর প্রভাব বিশ্লেষণ করা হয়েছে; পাশাপাশি নীতিগত সমাধানের পথ নির্দেশ করা হয়েছে।
ভূমিকা
আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মৌলিক ভিত্তি। কিন্তু বাংলাদেশে ক্রমবর্ধমানভাবে এমন একটি বাস্তবতা দৃশ্যমান হচ্ছে, যেখানে অপরাধের বিচার আদালতে নয়, বরং রাস্তায় ও জনতার হাতে সংঘটিত হচ্ছে। মব ভায়োলেন্স—যা কখনো গণপিটুনি, কখনো তথাকথিত ‘জনতার বিচার’ হিসেবে চিহ্নিত—মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘনের পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব ও গণতান্ত্রিক বৈধতার ওপর সরাসরি আঘাত হানছে।
বাংলাদেশে মব ভায়োলেন্স: পরিসংখ্যান ও প্রবণতা
জাতীয় মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে মব সহিংসতা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৪ সালে প্রায় ১২৮ জন মব লিঞ্চিংয়ে নিহত হন। মানবাধিকার সহায়তা সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত অন্তত ১৫৬ জন মব ভায়োলেন্সে প্রাণ হারান। আরও বিস্তৃত পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০২৪ সালের অগাস্ট থেকে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর—এই ১৩ মাসে নিহতের সংখ্যা ২০০ ছাড়িয়েছে।
সংজ্ঞাগত পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও সামগ্রিক চিত্র স্পষ্ট—মব ভায়োলেন্স বাংলাদেশে আর ব্যতিক্রমী ঘটনা নয়; এটি ধারাবাহিক ও কাঠামোগত সহিংসতায় রূপ নিয়েছে।
শরিফ ওসমান হাদীর মৃত্যু ও সহিংস রাজনৈতিক বাস্তবতা
ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক ও মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদী গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত অবস্থায় চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে নেওয়া হয় এবং সেখানেই মৃত্যুবরণ করেন।
যদিও হাদীর মৃত্যু সরাসরি মব লিঞ্চিংয়ের (mob lynching) ঘটনা নয়, তবে এটি একই সহিংস রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতার অংশ—যেখানে রাজনৈতিক সংগঠন, নাগরিক আন্দোলন ও মতপ্রকাশ ক্রমেই প্রাণঘাতী ঝুঁকির মুখে পড়ছে। এই বাস্তবতা বাংলাদেশকে একটি “ভয়ের রাষ্ট্র” (Fear State) হিসেবে চিহ্নিত করে, যেখানে নাগরিকরা নিরাপত্তাহীনতার কারণে আত্মনিয়ন্ত্রণ ও নীরবতার পথে হাঁটতে বাধ্য হয়।
মব ভায়োলেন্সের কাঠামোগত কারণসমূহ
বিচারহীনতা ও জবাবদিহির অভাব
মব সহিংসতার ঘটনায় মামলার সংখ্যা থাকলেও গ্রেপ্তার ও দণ্ডের হার অত্যন্ত কম। এই বিচারহীনতা ভিড়কে আরও সাহসী করে তোলে।
গুজব ও ডিজিটাল সহিংসতা
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যাচাইহীন তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং তাৎক্ষণিক ‘রায়’ হিসেবে কাজ করে। এতে জনতা উত্তেজিত হয়ে সহিংসতায় জড়িয়ে পড়ে।
রাজনৈতিক ও সামাজিক মেরুকরণ
তীব্র রাজনৈতিক বিভাজন সহিংসতাকে নৈতিক প্রতিশোধ হিসেবে উপস্থাপন করে, ফলে আইনগত সীমারেখা ঝাপসা হয়ে যায়।
রাষ্ট্রীয় উপস্থিতির দুর্বলতা
সময়োপযোগী ও দৃশ্যমান রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপের অভাব জনতাকে বিকল্প বিচারক হিসেবে আত্মপ্রকাশের সুযোগ দেয়।
মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের ওপর প্রভাব
মব ভায়োলেন্স সরাসরি জীবনাধিকারের লঙ্ঘন। পাশাপাশি এটি—
আইনের শাসনের প্রতি জনগণের আস্থা নষ্ট করে
সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে অধিক ঝুঁকিতে ফেলে
গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ ও মতপ্রকাশকে নিরুৎসাহিত করে
ফলে এটি গণতান্ত্রিক অবক্ষয়ের একটি প্রধান অনুঘটক হয়ে ওঠে।
নীতিগত সুপারিশ
১. মব ভায়োলেন্সকে বিশেষ ও অগ্রাধিকারভিত্তিক ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে ঘোষণা
২. মব সহিংসতার জন্য দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল গঠন
৩. গুজব শনাক্ত ও প্রতিরোধে জাতীয় ডিজিটাল ভেরিফিকেশন ইউনিট
৪. কমিউনিটি পুলিশিং ও নাগরিক শিক্ষার প্রসার
৫. প্রতিটি ঘটনায় স্বচ্ছ তদন্ত ও দৃশ্যমান জবাবদিহি নিশ্চিতকরণ
উপসংহার (Conclusion)
বাংলাদেশে মব ভায়োলেন্স রাষ্ট্র ও সমাজের যৌথ ব্যর্থতার বহিঃপ্রকাশ। এই সহিংসতার সংস্কৃতি ভাঙতে না পারলে মানবাধিকার, আইনের শাসন ও গণতন্ত্র আরও গভীর সংকটে পড়বে। শরিফ ওসমান হাদীর মৃত্যু আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার মূল্য শেষ পর্যন্ত নাগরিকদের জীবন দিয়েই পরিশোধ করতে হয়।
তথ্যসূত্র (References)
আইন ও সালিশ কেন্দ্র। (২০২৪)। বাংলাদেশে মানবাধিকার পরিস্থিতি ২০২৪। ঢাকা: ASK।
Human Rights Support Society. (২০২৫)। Human Rights Observation Report 2025 (January–November)। ঢাকা: HRSS।
United Nations. (1948). Universal Declaration of Human Rights. New York: United Nations.
United Nations Office of the High Commissioner for Human Rights. (2022). Human rights, vigilante violence and state responsibility. Geneva: United Nations.
লেখক পরিচিতি
লেখক পরিচিতি
মিনহাজ সামাদ চৌধুরী একজন স্বাধীন মানবাধিকার কর্মী, যিনি বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় সহিংসতা, রাজনৈতিক অধিকার, ধর্মীয় সংখ্যালঘু অধিকার এবং গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতা বিষয়ে গবেষণা ও লেখালেখি করেন।

No comments:
Post a Comment
Please validate CAPTCHA