ভূমিকা:
২১ ফেব্রুয়ারি শুধু একটি তারিখ নয়; এটি একটি চেতনা, একটি সংগ্রাম, একটি আত্মত্যাগের ইতিহাস। ১৯৫২ সালের এই দিনে মাতৃভাষা বাংলার মর্যাদা রক্ষায় যারা জীবন দিয়েছিলেন—তাদের আত্মত্যাগ শুধু ভাষার স্বীকৃতি অর্জন করেনি, বরং আমাদের জাতীয় পরিচয়ের ভিত্তি নির্মাণ করেছে।
আজকের এই মহান শহীদ দিবস এবং আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে আমরা গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করি সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারসহ সকল ভাষা শহীদকে।
ভাষা আন্দোলন: গণতন্ত্রের বীজরোপণ
ভাষা আন্দোলন ছিল উপনিবেশিক মানসিকতা ও সাংস্কৃতিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে প্রথম সংগঠিত গণপ্রতিরোধ। এটি প্রমাণ করেছে—
আত্মপরিচয়: ভাষা মানুষের আত্মপরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
মানবাধিকার: সাংস্কৃতিক অধিকার মৌলিক মানবাধিকারের অন্তর্ভুক্ত।
ন্যায়বিচার: রাষ্ট্রের ন্যায়বিচার ও স্থিতিশীলতা ভাষাগত সমতার উপর নির্ভরশীল।
১৯৫২ সালের সেই রক্তঝরা পথ ধরেই এসেছে ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীন বাংলাদেশ।
আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি: একুশ এখন বিশ্বের
১৯৯৯ সালে UNESCO ২১ ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এর মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী ভাষাগত বৈচিত্র্য ও সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদ রক্ষার গুরুত্ব নতুন করে প্রতিষ্ঠিত হয়।
আজ বিশ্বায়নের যুগে অনেক ছোট ভাষা বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে। একুশ আমাদের শেখায়—ভাষার বৈচিত্র্য রক্ষা মানেই মানবসভ্যতার বৈচিত্র্য রক্ষা করা।
ভাষা, মানবাধিকার ও সামাজিক ন্যায়
একজন মানবাধিকার রক্ষক হিসেবে আমি বিশ্বাস করি—
শিক্ষার অধিকার: মাতৃভাষায় শিক্ষা গ্রহণ করা প্রতিটি শিশুর মৌলিক অধিকার।
সংখ্যালঘু সুরক্ষা: ভাষাগত সংখ্যালঘুদের নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি সুরক্ষা করা রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।
গণতান্ত্রিক শর্ত: ভাষার স্বাধীন চর্চা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা গণতন্ত্রের অপরিহার্য শর্ত।
একুশ আমাদের মনে করিয়ে দেয়: ভাষার প্রশ্নে যেমন আপস নেই, মানব মর্যাদার প্রশ্নেও তেমন কোনো আপস হতে পারে না।
নতুন প্রজন্মের প্রতি আহ্বান
আজকের তরুণদের কাছে একুশ মানে শুধু প্রভাতফেরি বা শহীদ মিনারে ফুল দেওয়া নয়; এটি এক বৃহত্তর অঙ্গীকার—
সত্যের পক্ষে নির্ভীকভাবে দাঁড়ানো।
সকল প্রকার বৈষম্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার প্রতিবাদ।
সাংস্কৃতিক আত্মমর্যাদা রক্ষা করা।
একটি যুক্তিবাদী, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র গঠনের কাজ অব্যাহত রাখা।
উপসংহার
একুশ আমাদের শিখিয়েছে—রক্ত দিয়ে অর্জিত অধিকার কখনো বিস্মৃত হয় না। আজ আমরা পুনরায় প্রতিজ্ঞা করি—ভাষার মর্যাদা রক্ষা, গণতন্ত্রের চেতনা সমুন্নত রাখা এবং একটি মানবিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম চিরকাল অব্যাহত থাকবে।
শহীদদের আত্মত্যাগ বৃথা যেতে পারে না। জয় হোক মানবতার, জয় হোক মাতৃভাষার।
লেখক: মিনহাজ সামাদ চৌধুরী
স্বাধীন মানবাধিকার রক্ষক | উন্নয়নকর্মী | নীতি-অভিভাবক

No comments:
Post a Comment
Please validate CAPTCHA