বাংলাদেশের সাম্প্রতিক গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলেও নির্বাচন কমিশনের (ইসি) প্রকাশিত ফলাফলে এমন কিছু পরিসংখ্যান সামনে এসেছে যা সাধারণ গাণিতিক যুক্তিতেই অসম্ভব। কিছু আসনে ভোটার সংখ্যার চেয়ে আড়াই গুণ বেশি ভোট কাস্টিং দেখানো হয়েছে, আবার কোথাও ‘হ্যাঁ’ ভোটের সংখ্যা মোট ভোটারের সংখ্যাকেও ছাড়িয়ে গেছে।
এই প্রতিবেদনে আমরা নির্বাচন কমিশনের সরবরাহকৃত তথ্যের ভিত্তিতে প্রধান অসঙ্গতিগুলো তুলে ধরছি।
গণভোটের সামগ্রিক চিত্র (ইসির ভাষ্যমতে)
নির্বাচন কমিশনের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী দেশব্যাপী ভোটের হার ছিল নিম্নরূপ:
মোট ভোটার: ১২ কোটি ৭৭ লাখ ২ হাজার ৩৩৪ জন
মোট কাস্টিং হার: ৬০.২৬%
‘হ্যাঁ’ ভোট: ৪ কোটি ৮০ লাখ ৭৪ হাজার ৪২৯ (৬২.৪৭%)
‘না’ ভোট: ২ কোটি ২৫ লাখ ৬৫ হাজার ৬২৭ (২৯.৩২%)
বাতিল/অবৈধ ভোট: ৭৪ লাখ ২ হাজার ২৮৫
প্রধান অসঙ্গতিসমূহ: যেখানে অংক মিলছে না
পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে তিনটি বড় ধরনের গরমিল স্পষ্টভাবে লক্ষ্য করা গেছে:
১. রাজশাহী-৪: গাণিতিক অসম্ভাব্যতা (২৪৪% কাস্টিং)
রাজশাহী-৪ আসনে যে তথ্য প্রদান করা হয়েছে তা বিস্ময়কর। এখানে ভোটার সংখ্যার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি ভোট কাস্ট হয়েছে বলে দেখানো হয়েছে।
| বিবরণ | পরিসংখ্যান |
মোট ভোটার | ৩,১৯,৯০৯ |
কাস্টকৃত ভোট | ৭,৮১,৫২৩ |
কাস্টিং হার | ২৪৪.২৯৫% |
বিশ্লেষণ: কোনো বৈধ নির্বাচনে কাস্টিং হার ১০০% এর বেশি হওয়া অসম্ভব। এখানে ২৪৪% কাস্টিং হার নির্দেশ করে যে ডাটা এন্ট্রিতে হয় চরম গাফিলতি হয়েছে অথবা ফলাফল প্রক্রিয়াকরণে বড় কোনো ত্রুটি রয়ে গেছে।
২. নেত্রকোনা-৩, ৪ ও ৫: অদ্ভুত বৈপরীত্য
নেত্রকোনার আসনগুলোতে ডাটা এমনভাবে উপস্থাপিত হয়েছে যেখানে ‘হ্যাঁ’ ভোট মোট ভোটারের চেয়েও বেশি, কিন্তু আবার কাস্টিং হার দেখানো হয়েছে মাত্র ৫৬%।
উদাহরণ: নেত্রকোনা-৩
মোট ভোটার: ৪,২০,৬৮৬
প্রদর্শিত ‘হ্যাঁ’ ভোট: ৫,০২,৪৩৮ (ভোটার সংখ্যার চেয়ে ৮১,৭৫২ বেশি!)
অথচ প্রদর্শিত মোট কাস্ট ভোট: ২,৩৮,৩৫৮ (৫৬.৬৫৯%)
একই অংকে ‘হ্যাঁ’ ভোট ৫ লাখের বেশি কিন্তু মোট ভোট ২ লাখের কিছু বেশি—এটি স্রেফ টাইপো নাকি পদ্ধতিগত ত্রুটি, তার ব্যাখ্যা প্রয়োজন।
৩. সিরাজগঞ্জ-১: একই দিনে দুই চিত্র
সিরাজগঞ্জ-১ আসনে একই দিন সংসদ নির্বাচন এবং গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। একই ভোটার তালিকায় ভোটের হারে বিশাল ব্যবধান দেখা গেছে।
সংসদ নির্বাচনে ভোট: ৬০.৮৩%
গণভোটে ভোট: ৭.৮৯৯%
‘না’ জয়ী ১১টি আসন
দেশব্যাপী ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলেও ২৯৯টি আসনের মধ্যে ১১টিতে ‘না’ ভোট জয়ী হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য:
পার্বত্য তিন জেলা (রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান)
গোপালগঞ্জের ৩টি আসন
রাজশাহী-৪ (সংশোধিত তথ্যের আগে)
রাতের বেলা কিছু তথ্য সংশোধনের দাবি করা হলেও নেত্রকোনার মতো জটিল গরমিলগুলো এখনো অমীমাংসিত।
কেন এই গরমিল? সম্ভাব্য কারণসমূহ
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের পরিসংখ্যানগত বিপর্যয়ের পেছনে চারটি প্রধান কারণ থাকতে পারে:
ম্যানুয়াল ডাটা এন্ট্রি ত্রুটি: কেন্দ্র থেকে আসা তথ্য সফটওয়্যারে ইনপুট দেওয়ার সময় ভুল।
সফটওয়্যার সিঙ্ক সমস্যা: কেন্দ্রীয় সার্ভারের সাথে আঞ্চলিক অফিসের ডাটা মিল না হওয়া।
যাচাইহীন ফলাফল প্রকাশ: কোনো প্রকার অডিট বা ক্রস-চেক ছাড়াই তড়িঘড়ি করে ফল ঘোষণা।
টেকনিক্যাল গ্লিচ: বড় ভলিউমের ডাটা প্রসেস করতে গিয়ে অ্যালগরিদমিক ত্রুটি।
স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার দাবি
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নির্বাচন কমিশনের তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান সংকট নিরসনে আমরা দাবি জানাচ্ছি:
প্রতিটি আসনের Raw Data বা কাঁচা তথ্য প্রকাশ করা।
কেন ভোটার সংখ্যার চেয়ে বেশি ভোট প্রদর্শিত হলো তার প্রযুক্তিগত ব্যাখ্যা দেওয়া।
একটি স্বাধীন টেকনিক্যাল কমিটি দ্বারা পরিসংখ্যানের ফরেনসিক অডিট করা।
প্রতিটি কেন্দ্রের ফলাফল উন্মুক্ত করা যাতে নাগরিকরা তা মিলিয়ে দেখতে পারে।
উপসংহার
নির্বাচনে জয়-পরাজয় বড় কথা নয়, বরং প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতাই গণতন্ত্রের মূল শক্তি। যখন ২৪৪% কাস্টিং হারের মতো তথ্য সরকারিভাবে আসে, তখন তা পুরো নির্বাচনী ব্যবস্থার প্রতি জনমনে আস্থার সংকট তৈরি করে। জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা ছাড়া এই বিতর্ক নিরসন সম্ভব নয়।
লিখেছেন: মিনহাজ সামাদ চৌধুরী
ইন্ডিপেন্ডেন্ট হিউম্যান রাইটস ডিফেন্ডার ফোকাস: গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতা | নির্বাচনী স্বচ্ছতা | বাংলাদেশে মানবাধিকার
প্রকাশিত: ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ I
ট্যাগ/লেবেল: Bangladesh Referendum 2026, Election Commission Bangladesh, Rajshahi-4 Vote Casting, Netrokona Election Data, Sirajganj Referendum, Electoral Transparency, Democratic Accountability, Bangladesh Politics, Human Rights Bangladesh
Related Topics:
South Asia Elections in Focus: Close Margins, Viral Narratives, and Post-Election Legitimacy

No comments:
Post a Comment
Please validate CAPTCHA