🇧🇩 Bangladesh HR Defender
মানবাধিকার, আইনের শাসন ও গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতা — প্রতিটি মানুষই নিজের জীবনের লেখক
কথাটি শুনতে সহজ, কিন্তু যারা মাদকের গহ্বরে পড়েছেন তাদের জন্য এটি এক অসম্ভব যাত্রার মতো মনে হয়। তবু বাংলাদেশের হাজারো তরুণ-তরুণী প্রতিদিন প্রমাণ করে দিচ্ছেন — ভুলের অন্ধকার থেকে ফিরে আসা সম্ভব, এবং সেই প্রত্যাবর্তনই জীবনের সবচেয়ে সুন্দর অধ্যায় হয়ে ওঠে।
📖 সজীবের গল্প: মুছে যাওয়া পাতায় নতুন অক্ষর
নেত্রকোনার এক ছোট প্রত্যন্ত গ্রামে জন্ম নেওয়া সজীব ছোটবেলা থেকেই ছিল অসাধারণ মেধাবী। তার বাবা ছিলেন স্কুল শিক্ষক, মা গৃহিণী। সংসারের সীমিত আয় সত্ত্বেও তারা সজীবের পড়াশোনার জন্য সবকিছু ত্যাগ করতেন। সজীব প্রতিদিন ভোরে উঠে পড়ত, গ্রামের ছোট ছোট শিশুদের বিনামূল্যে পড়াত এবং স্বপ্ন দেখত — একদিন ডাক্তার বা প্রকৌশলী হয়ে গ্রামের মানুষের সেবা করবে।
এসএসসিতে জিপিএ-৫ এবং এইচএসসিতে বাণিজ্য বিভাগে মেধা তালিকায় তৃতীয় স্থান অধিকার করে সজীব রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যবস্থাপনা বিভাগে ভর্তি হয়। গ্রামের সবাই তার সাফল্যে গর্বিত ছিল। কিন্তু শহরের জীবন, নতুন বন্ধুবান্ধব এবং একটু বেশি স্বাধীনতা তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিল।
প্রথম বর্ষে এক বন্ধুর জন্মদিনের পার্টিতে সে প্রথমবার ইয়াবা ট্যাবলেট খায়। বন্ধুরা বলেছিল, “শুধু একবার চেষ্টা করে দেখ, স্ট্রেস কমে যাবে, পড়াশোনায় মন বসবে।” কৌতূহল আর বন্ধুদের চাপে সজীব প্রথমবার সেই বিষাক্ত ট্যাবলেট মুখে দেয়। প্রথম দিন সে অনুভব করেছিল এক অদ্ভুত উত্তেজনা ও আত্মবিশ্বাস। কিন্তু সেই “একবার” ধীরে ধীরে প্রতি সপ্তাহে, তারপর প্রতিদিনে পরিণত হয়।
পড়াশোনা একেবারে বন্ধ হয়ে যায়। ক্লাস ফাঁকি, পরীক্ষায় ফেল, বাড়িতে মিথ্যা বলা, টাকার জন্য চুরি — সবকিছু শুরু হয়। তার মা প্রতি রাতে কাঁদতেন, বাবা স্কুলের চাকরি ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। গ্রামের লোকজন তাদের এড়িয়ে চলতে শুরু করে। সজীবের শরীর ভেঙে পড়ে, চোখের নিচে কালি, হাত কাঁপত, মনে অস্থিরতা। একদিন সে গুরুতর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়। ডাক্তার স্পষ্ট বলে দেন, “যদি এখনই না থামে, তাহলে ফিরে আসার আর কোনো সুযোগ থাকবে না।”
“আমি ভেবেছিলাম আমার গল্প শেষ। কিন্তু হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে মায়ের চোখের জল আর বাবার ভাঙা কণ্ঠস্বর আমাকে নাড়া দেয়। আমি বুঝতে পারি — আমি আমার জীবনের লেখক। ভুল লিখেছি, কিন্তু গল্প এখনও শেষ হয়নি।”
সজীবের বড় ভাই তাকে জোর করে একটি স্বনামধন্য পুনর্বাসন কেন্দ্রে নিয়ে যান। প্রথম কয়েক সপ্তাহ ছিল অত্যন্ত কষ্টকর — শরীরে ব্যথা, ঘুম না আসা, মানসিক অস্থিরতা। কিন্তু কাউন্সেলরদের অকুন্ঠ সমর্থন, গ্রুপ থেরাপি, যোগব্যায়াম, খেলাধুলা এবং লেখালেখির সেশন তাকে ধীরে ধীরে ফিরিয়ে আনে। সে আবার ডায়েরি লিখতে শুরু করে। প্রতিদিন লিখত: “আমি আবার নতুন করে লিখব।”
ছয় মাস পর সজীব যখন বেরিয়ে আসে, সে সম্পূর্ণ নতুন মানুষ। আজ সে ঢাকার একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থায় প্রজেক্ট কোঅর্ডিনেটর হিসেবে কাজ করছে। নিজের গ্রামে ‘আলোর পথ’ যুব সংগঠন গড়ে তুলেছে, যেখানে সে মাদকাসক্ত তরুণদের কাউন্সেলিং করে, দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ দেয় এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করে। তার গ্রামের অনেক তরুণ তার দেখাদেখি মাদক ছেড়ে দিয়েছে।
মাদকমুক্ত সুখী বাংলাদেশ গড়ার ডাক
সজীবের মতো হাজারো তরুণ আজ প্রমাণ করছে — ভুল থেকে ফিরে আসা সম্ভব। আসুন আমরা সবাই তাদের পাশে দাঁড়াই।
“আমি আমার জীবনের লেখক। ভুল হলে ফিরে এসে আবার সুন্দর করে লিখব। যারা হারিয়ে গেছে, তাদের হাত ধরে ফিরিয়ে আনব। একসাথে গড়ব মাদকমুক্ত সুখী বাংলাদেশ।” আমিও শপথ নিচ্ছি

No comments:
Post a Comment
Please validate CAPTCHA