যারা নীরব থাকতে পারেননি
দক্ষিণ এশিয়ার বিদ্রোহী বিবেকের গল্প—ঈশ্বরচন্দ্র থেকে মালালা, সংস্কার থেকে প্রতিবাদ, আর শিক্ষা থেকে স্বাধীনতা।
এটি কোনো “মহান ব্যক্তির” পূজামূলক জীবনী নয়। এটি ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সংস্কারচেতনা থেকে মালালার বিদ্যালয়-অভিযান পর্যন্ত—দক্ষিণ এশিয়ার নিজের বিবেকের সঙ্গে দেড় শতাব্দীর কথোপকথনের গল্প।
কোনো সমাজের সবচেয়ে শক্তিশালী দেয়াল সবসময় ইট-পাথরের হয় না। কিছু দেয়াল তৈরি হয় এমন বিশ্বাস দিয়ে, যেগুলোকে এত দীর্ঘ সময় ধরে সত্য বলে মানা হয়েছে যে একসময় সেগুলোকে প্রশ্ন করাটাই বিপজ্জনক হয়ে ওঠে।
গত দেড় শতাব্দী ধরে দক্ষিণ এশিয়ায় এমন অসংখ্য মানুষ জন্মেছেন বা কাজ করেছেন, যারা ধর্ম, জাতপাত, পুরুষতন্ত্র, ঔপনিবেশিকতা, রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন, সাম্প্রদায়িকতা, অশিক্ষা এবং সামাজিক উদাসীনতার সামনে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁদের পথ এক ছিল না। তাঁদের চিন্তাও এক ছিল না।
কেউ কবি, কেউ আইনজ্ঞ, কেউ শিক্ষক, কেউ যুক্তিবাদী, কেউ অহিংস রাজনৈতিক সংগঠক, কেউ নির্বাসিত লেখক, কেউ বিশ্বাসনির্ভর মানবসেবী, আবার কেউ কিশোরী শিক্ষার্থী। কিন্তু তাঁদের গল্প এক জায়গায় এসে মিলেছে— মানুষের মর্যাদার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো কোনো ব্যবস্থাকে তাঁরা চূড়ান্ত বলে মেনে নিতে পারেননি।
আমাদের আগে কারা প্রশ্ন করেছিল?
একটি মোবাইল স্ক্রিন থেকে ইতিহাসের দরজায়
দক্ষিণ এশিয়ার কোনো এক শহরে এক তরুণী গভীর রাতে মোবাইল ফোনে খবর দেখছে। ঘরের আলো নিভে গেছে, কিন্তু ছোট্ট পর্দাটি এখনো জ্বলছে।
একটির পর একটি সংবাদ উঠে আসছে—কোথাও ধর্মের পরিচয়ে মানুষ আক্রান্ত, কোথাও নারী তার নিজের জীবন সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার হারাচ্ছে, কোথাও জন্মের পরিচয় এখনো সামাজিক মর্যাদা নির্ধারণ করছে, কোথাও লেখক হুমকির মুখে, কোথাও শিক্ষার্থী প্রশ্ন করার অপরাধে অভিযুক্ত।
কোথাও যুদ্ধ। কোথাও উদ্বাস্তু। কোথাও অনলাইন ঘৃণা। কোথাও এমন একটি বই নিয়ে তুমুল প্রতিবাদ, যা অনেকেই হয়তো পড়েও দেখেনি।
তরুণীটি স্ক্রল করতে করতে একসময় থেমে যায়। তার মনে প্রশ্ন আসে—
আমাদের আগে কি কেউ এসব প্রশ্ন করেনি?
আর যারা প্রথম প্রশ্ন করেছিল, তাদের কী হয়েছিল?
ইতিহাসের দরজা সেখানেই খুলে যায়।
দেখা যায়, দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাস শুধু রাজা, যুদ্ধ, নির্বাচন, স্বাধীনতা কিংবা সীমান্তের ইতিহাস নয়। এটি প্রশ্ন করারও ইতিহাস।
কখনো প্রশ্নটি লেখা হয়েছে কবিতায়। কখনো মেয়েদের জন্য খোলা হয়েছে একটি বিদ্যালয়ের দরজা। কখনো একটি সাম্রাজ্যিক সম্মান ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। কখনো জাতপাতের বিরুদ্ধে আইন লেখা হয়েছে। কখনো হাজার বছরের সামাজিক বিশ্বাসের সামনে কেবল একটি শব্দ রাখা হয়েছে—কেন?
কখনো অস্ত্রের বদলে অহিংস সংগঠন তৈরি হয়েছে। কখনো কারাগারের ভেতর জন্ম নেওয়া কবিতা রাষ্ট্রের সীমানা পেরিয়ে গেছে। কখনো লেখার মূল্য হয়েছে নির্বাসন। কখনো রাস্তায় পড়ে থাকা মৃত্যুপথযাত্রী মানুষের পাশে দাঁড়ানো হয়েছে। আবার কখনো স্কুলে যাওয়ার অধিকারের জন্য একটি কিশোরী গুলিবিদ্ধ হয়েছে।
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর
সংস্কারের ভিত্তি নির্মাতা
‘এক শতাব্দী’র গল্প শুরু করার আগে আমাদের এক পা পিছিয়ে দাঁড়াতে হবে। কারণ রবীন্দ্রনাথ, রোকেয়া বা নজরুলের পূর্ববর্তী প্রজন্মের এক ব্যক্তি এমন কিছু ভিত্তি তৈরি করে গিয়েছিলেন, যা ছাড়া পরবর্তী বিদ্রোহীরা হয়তো এত দূর এগোতে পারতেন না।
তিনি ছিলেন একজন আপাতদৃষ্টিতে ‘শিক্ষক’—পাঠ্যপুস্তক প্রণেতা, কলেজের অধ্যক্ষ। কিন্তু তাঁর কলম ও বক্তৃতা সমাজের গভীর শিকড়ে আঘাত করেছিল।
১৮৫৬ সালের বিধবা বিবাহ আইন পাসের পেছনে তাঁর নিরলস প্রচেষ্টা ছিল অসাধারণ। সমাজের গোঁড়া অংশ যখন বলেছিল—শাস্ত্রে নিষেধ আছে, তখন তিনি শাস্ত্রের পাতা উল্টে দেখিয়েছিলেন, নিষেধ নয়, সমর্থন আছে।
কুসংস্কারের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হলে ধর্মগ্রন্থের গভীরে যেতে হয়, পৃষ্ঠে নয়—এটি ছিল বিদ্যাসাগরের কৌশলী মুক্তচিন্তা।
তিনি নারীশিক্ষার জন্য সংগ্রাম করেছেন, বহুবিবাহ ও শৈশববিবাহের বিরোধিতা করেছেন, এবং বাংলা গদ্যকে এতটাই সরল ও শক্তিশালী করেছেন যে সাধারণ মানুষও আইন ও বিজ্ঞান বুঝতে শুরু করে।
বেগম রোকেয়া যখন ‘লেডিস ল্যান্ড’-এর স্বপ্ন দেখছেন, তখন বিদ্যাসাগর ইতিমধ্যে কলকাতায় একাধিক বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করে দেখিয়েছিলেন—শিক্ষার দরজা মেয়েদের জন্য বন্ধ রাখার কোনো যুক্তি নেই।
সময়ের নিরিখে তিনি ‘দেড় শতাব্দী’রও আগে। কিন্তু চিন্তার নিরিখে তিনি এই গল্পের এক অনিবার্য পূর্বসূরি। তাঁকে বাদ দিলে রোকেয়ার স্কুল, নজরুলের সাম্যবাদ, এমনকি আম্বেদকরের আইনি লড়াইয়ের বীজ কোথা থেকে এল—তা বোঝা কঠিন হয়ে যায়।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
সীমানার ওপারে মানুষ
একটি সম্মান কখন অপমানের ভার হয়ে ওঠে?
১৯১৯ সালের জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের পর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ব্রিটিশ সরকারের দেওয়া নাইট উপাধি প্রত্যাখ্যান করেন। এটি কোনো রাজনৈতিক স্লোগান ছিল না; ছিল নৈতিক বিচ্ছেদের ঘোষণা।
যে রাষ্ট্রের ক্ষমতা নিরস্ত্র মানুষের ওপর গুলি চালিয়েছে, সেই রাষ্ট্রের বিশেষ সম্মান বহন করা তাঁর বিবেকের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না।
কিন্তু রবীন্দ্রনাথের বিদ্রোহ এখানেই শেষ নয়। তিনি ঔপনিবেশিক শাসনের সমালোচক ছিলেন, আবার একই সঙ্গে আগ্রাসী ও অন্ধ জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধেও সতর্ক করেছিলেন।
তাঁর প্রশ্ন ছিল অস্বস্তিকর: দেশপ্রেম কি এমন জায়গায় পৌঁছাতে পারে, যেখানে মানুষ অন্য জাতিকে ঘৃণা করতে শিখে?
নিজের দেশকে ভালোবাসা যায়; কিন্তু সেই ভালোবাসা যদি মানুষের বৃহত্তর মর্যাদাকে গ্রাস করে, তবে দেশপ্রেমও প্রশ্নের মুখে দাঁড়ায়।
শান্তিনিকেতন এবং পরে বিশ্বভারতীর মাধ্যমে তিনি এমন একটি শিক্ষার স্বপ্ন দেখেছিলেন, যেখানে শিক্ষা কেবল পরীক্ষার নম্বর নয়; প্রকৃতি, সংস্কৃতি, বিশ্বদৃষ্টি ও স্বাধীন চিন্তার সঙ্গে মানুষের সম্পর্কও গুরুত্বপূর্ণ।
রবীন্দ্রনাথের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হয়তো এই: মুক্তচিন্তা শুধু প্রতিপক্ষকে প্রশ্ন করা নয়; নিজের পক্ষের জনপ্রিয় ধারণাকেও প্রশ্ন করতে পারা।
বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন
বন্ধ জানালার সামনে একটি বই
এবার একটি অন্য দরজার সামনে দাঁড়াই। সাম্রাজ্যের দরজা নয়—ঘরের দরজা।
দরজার ওপারে বই আছে, শিক্ষা আছে, বাইরে যাওয়ার স্বাধীনতা আছে। আর এ পাশে একটি মেয়ে, যাকে সমাজ বলছে— সব জ্ঞান তোমার জন্য নয়।
রোকেয়ার বিদ্রোহ শুরু হয়েছিল অক্ষর দিয়ে। তারপর সেই অক্ষর হয়ে উঠেছিল স্কুল, প্রবন্ধ, ব্যঙ্গ, সংগঠন এবং নারীকে নিজের জীবন নিয়ে ভাবতে শেখানোর আহ্বান।
তিনি শুধু বলেননি যে মেয়েদেরও পড়াশোনা করা দরকার। তিনি আরও গভীর প্রশ্ন তুলেছিলেন— যে সমাজ নারীকে চিন্তা করার ক্ষমতা থেকে বঞ্চিত করে, সে নিজেকে সভ্য বলে কীভাবে?
তাঁর Sultana's Dream ছিল সাহসী কল্পনার পরীক্ষা। বাস্তব সমাজের ক্ষমতার সম্পর্ক উল্টে দিয়ে তিনি দেখিয়েছিলেন, যে অন্যায়কে আমরা প্রতিদিন দেখে অভ্যস্ত, সেটি উল্টো করে দেখলে তার অযৌক্তিকতা অনেক স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
কিন্তু কলমের চেয়েও কঠিন ছিল বাস্তবে একটি বিদ্যালয় চালানো। পরিবারকে বোঝানো, সামাজিক প্রতিরোধ মোকাবিলা করা, এবং শিক্ষা যে নারীর আত্মমর্যাদার ভিত্তি—এই ধারণা প্রতিষ্ঠা করা।
রোকেয়ার হাতে বই ছিল শুধু জ্ঞানের প্রতীক নয়; সেটি ছিল বন্ধ দরজার চাবি।
কাজী নজরুল ইসলাম
যখন কবিতা শিকলকে চ্যালেঞ্জ করে
একটি সাম্রাজ্য একজন কবিকে বন্দী করতে পারে। সংবাদপত্র বন্ধ করতে পারে। লেখা বাজেয়াপ্ত করতে পারে।
কিন্তু শব্দকে?
দারিদ্র্যের ভেতর থেকে উঠে আসা নজরুল সৈনিক হয়েছেন, সাংবাদিক হয়েছেন, কবি হয়েছেন—আর শেষে হয়ে উঠেছেন একটি অস্বস্তিকর কণ্ঠ।
তাঁর বিদ্রোহ শুধু ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে ছিল না। তিনি সাম্প্রদায়িকতা, জাতপাত, শোষণ, ধর্মীয় ভণ্ডামি এবং মানুষের ওপর মানুষের আধিপত্যকেও আক্রমণ করেছেন।
তাঁর সৃষ্টিতে ইসলামী ঐতিহ্য যেমন আছে, তেমনি হিন্দু পুরাণ, ফারসি সংস্কৃতি এবং বাংলার লোকজ ভাষাও আছে। এই সাংস্কৃতিক মিশ্রণ নিজেই ছিল বিভাজনের বিরুদ্ধে এক সৃজনশীল প্রতিবাদ।
একটি সাম্রাজ্যের মেয়াদ শেষ হতে পারে; কিন্তু মানুষের মুখে বেঁচে থাকা একটি গান অনেক দীর্ঘ জীবন পায়।
নজরুল আমাদের শেখান, শিল্প ও প্রতিবাদ একে অপরের বিপরীত নয়। বরং কখনো শিল্পই প্রতিবাদের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী ভাষা।
ড. ভীমরাও রামজি আম্বেদকর
এক গ্লাস পানি এবং সভ্যতার পরীক্ষা
একটি শিশুকে যদি শেখানো হয় যে তার ছোঁয়ায় পানি অপবিত্র, তাহলে সে মানুষের সমতা সম্পর্কে কী শিখবে?
আম্বেদকর জাতপাতের অন্যায় কোনো বই থেকে শেখেননি। তিনি সামাজিক অপমানের বাস্তব অভিজ্ঞতা বহন করেছিলেন।
কিন্তু তাঁর অসাধারণতা ছিল— ব্যক্তিগত অপমানকে তিনি ব্যক্তিগত প্রতিশোধে সীমাবদ্ধ রাখেননি। তিনি সেটিকে শিক্ষা, আইন, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের বৃহৎ প্রশ্নে রূপ দেন।
তাঁর কেন্দ্রীয় প্রশ্ন ছিল: যে সমাজ জন্মের ভিত্তিতে মানুষের মর্যাদা নির্ধারণ করে, সেখানে গণতন্ত্র কেবল ভোটের ব্যবস্থায় টিকে থাকতে পারে কি?
ভারতের সংবিধান প্রণয়নে তাঁর ঐতিহাসিক ভূমিকা সমতা, স্বাধীনতা এবং বৈষম্যবিরোধী আইনি কাঠামো নির্মাণে গভীর প্রভাব ফেলে। কিন্তু তিনি জানতেন—আইনে সমতা লেখা আর সমাজে সমতা প্রতিষ্ঠা করা এক বিষয় নয়।
অন্যায় শুধু অত্যাচারীর ঘৃণায় বেঁচে থাকে না; কখনো সুবিধাভোগীর নীরবতাতেও বেঁচে থাকে।
ই. ভি. রামাসামি ‘পেরিয়ার’
প্রাচীন বলেই কি সত্য?
একটি বিশ্বাস হাজার বছরের পুরোনো। তাই কি সেটি সত্য?
একটি সামাজিক নিয়ম বহু প্রজন্ম ধরে চলে আসছে। তাই কি সেটি ন্যায়সঙ্গত?
পেরিয়ারের রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মজীবনের কেন্দ্রে ছিল এই ধরনের নির্মম প্রশ্ন।
তিনি জাতপাত, ব্রাহ্মণ্যবাদী সামাজিক আধিপত্য, ধর্মীয় কর্তৃত্ব, কুসংস্কার এবং নারীর অসম অবস্থানকে প্রকাশ্যে চ্যালেঞ্জ করেন।
Self-Respect Movement-এর মাধ্যমে আত্মমর্যাদা, যুক্তিবাদ, সামাজিক সমতা এবং জন্মগত শ্রেষ্ঠত্বের বিরুদ্ধে সংগঠিত সামাজিক প্রচার চালানো হয়।
পেরিয়ারের ভাষা ছিল কঠোর, কখনো আক্রমণাত্মকও। তাঁর সমর্থকেরা এটিকে প্রয়োজনীয় সামাজিক ধাক্কা হিসেবে দেখেছেন; সমালোচকেরা তাঁর কিছু বক্তব্যকে অতিরিক্ত সাধারণীকরণমূলক বা বিভাজনসৃষ্টিকারী বলেছেন।
এই বিতর্ক তাঁর গুরুত্ব কমায় না; বরং একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি শেখায়— যে মানুষ কর্তৃত্বকে প্রশ্ন করেন, তাঁর নিজের বক্তব্যও প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নয়।
খান আবদুল গফ্ফার খান
অস্ত্রহীন সাহস
পশতুন সমাজকে দীর্ঘদিন যুদ্ধ, অস্ত্র ও প্রতিশোধের stereotyped চিত্রে দেখা হয়েছে। সেই সমাজেই আবদুল গফ্ফার খান অহিংস প্রতিরোধের একটি ব্যাপক রাজনৈতিক আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন।
তাঁর Khudai Khidmatgar আন্দোলন শিক্ষা, সামাজিক সেবা, আত্মশৃঙ্খলা এবং ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে অহিংস প্রতিরোধকে একত্র করেছিল।
অহিংসা তাঁর কাছে নিষ্ক্রিয়তা ছিল না। বরং প্রতিশোধ নেওয়ার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও প্রতিশোধের রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রত্যাখ্যান করার কঠিন নৈতিক সিদ্ধান্ত।
প্রতিপক্ষকে পরাজিত করার আগে নিজের প্রতিশোধস্পৃহাকে পরাজিত করা যায় কি?
তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে ভারত, পাকিস্তান ও পশতুন জাতীয় রাজনীতিতে নানা ব্যাখ্যা ও মতপার্থক্য রয়েছে। কিন্তু তাঁর ঐতিহাসিক পরীক্ষা আজও গুরুত্বপূর্ণ: সহিংস পরিবেশেও কি অহিংস সংগঠন সাহসের ভাষা হতে পারে?
ফয়েজ আহমদ ফয়েজ
কারাগারের দেয়াল পেরিয়ে যাওয়া কবিতা
প্রেমের কবিতা আর প্রতিবাদের কবিতা কি একই কলমে লেখা যায়?
ফয়েজ দেখিয়েছিলেন—যায়।
তিনি প্রগতিশীল লেখক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, সাংবাদিকতা করেছেন, শ্রমজীবী ও নিপীড়িত মানুষের অধিকারের পক্ষে লিখেছেন, এবং রাজনৈতিক নিপীড়নেরও মুখোমুখি হয়েছেন।
১৯৫১ সালের Rawalpindi Conspiracy Case-এ তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। কারাবাস ও পরবর্তী নির্বাসনের অভিজ্ঞতা তাঁর সাহিত্যকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।
তাঁর বিশেষ কৃতিত্ব ছিল— প্রতিবাদকে স্লোগানে সংকুচিত না করে কবিতাই রেখে দেওয়া।
নজরুলের মতো তাঁর জীবনও দেখায়— বিদেশি শাসনের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা অর্জনের পরও মতপ্রকাশ ও রাজনৈতিক স্বাধীনতার সংগ্রাম শেষ হয়ে যায় না।
তাসলিমা নাসরিন
একজন নারী যখন নিষিদ্ধ প্রশ্ন করেন
এবার গল্প আধুনিক রাষ্ট্রের সময়ে আসে। সংবাদমাধ্যম আছে, বিশ্ববিদ্যালয় আছে, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কাঠামো আছে। তবু একটি প্রশ্নের মূল্য হতে পারে—হুমকি, নিষেধাজ্ঞা এবং নির্বাসন।
চিকিৎসক হিসেবে পেশাজীবন শুরু করলেও তাসলিমা নাসরিন লেখালেখির মাধ্যমে নারীস্বাধীনতা, পুরুষতন্ত্র, যৌনতা, ধর্মীয় কর্তৃত্ব, সাম্প্রদায়িকতা এবং ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রশ্নে তীব্র জনপরিসর তৈরি করেন।
১৯৯৩ সালে লজ্জা প্রকাশের পর তাঁকে ঘিরে বিতর্ক ও হুমকি তীব্র হয়। পরবর্তী সময়ে তাঁর জীবনে আত্মগোপন, দেশত্যাগ ও দীর্ঘ নির্বাসন আসে।
তাঁকে নিয়ে মতবিরোধ গভীর। সমর্থকেরা তাঁকে নারীস্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সাহসী কণ্ঠ হিসেবে দেখেন। সমালোচকেরা তাঁর ধর্ম ও সমাজবিষয়ক কিছু বক্তব্যকে অতিরিক্ত সাধারণীকরণ, আক্রমণাত্মক ভাষা বা জটিল সামাজিক বাস্তবতাকে সরলীকরণের অভিযোগে দেখেছেন।
এই দুই অবস্থানের মধ্যেই মুক্তচিন্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি দাঁড়ায়:
একটি বইয়ের উত্তর আরেকটি বই হতে পারে। একটি বক্তব্যের উত্তর প্রতিবাদ হতে পারে। কিন্তু মতের উত্তর সহিংসতা নয়।
তাঁর জীবন আরেকটি কঠিন প্রশ্নও তোলে: মতপ্রকাশের স্বাধীনতা কি শুধু বলার অধিকার, নাকি বলার পদ্ধতিরও সামাজিক দায়িত্ব আছে?
মাদার তেরেসা
রাস্তার পাশে পড়ে থাকা মানুষটিও মানুষ
এ পর্যন্ত এই গল্পের মানুষরা প্রধানত কোনো কাঠামোকে প্রশ্ন করেছেন— সাম্রাজ্য, জাতপাত, পুরুষতন্ত্র, ধর্মীয় কর্তৃত্ব বা রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন।
মাদার তেরেসা গল্পে অন্য একটি প্রশ্ন নিয়ে প্রবেশ করেন।
সামনে একজন অসুস্থ, পরিত্যক্ত, মৃত্যুপথযাত্রী মানুষ পড়ে আছে। আপনি কি প্রথমে সমাজব্যবস্থা বদলাবেন, নাকি মানুষটিকে তুলে নেবেন?
বর্তমান উত্তর মেসিডোনিয়ার স্কোপিয়েতে জন্ম নেওয়া Agnes Gonxha Bojaxhiu পরে ক্যাথলিক সন্ন্যাসিনী হিসেবে ভারতে আসেন এবং কলকাতাকে তাঁর মানবসেবার কেন্দ্র করেন।
Missionaries of Charity প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তিনি অসুস্থ, দরিদ্র, অনাথ ও মৃত্যুপথযাত্রী মানুষের সেবাকে নিজের ধর্মীয় আহ্বানের কেন্দ্রে রাখেন। ১৯৭৯ সালে তিনি নোবেল শান্তি পুরস্কার লাভ করেন।
তাঁকে রবীন্দ্রনাথ, পেরিয়ার বা তাসলিমার অর্থে মুক্তচিন্তক বলা সঠিক হবে না। তিনি ছিলেন গভীর ধর্মবিশ্বাসনির্ভর মানবসেবী।
তবু মানবতাবাদের আলোচনায় তাঁর স্থান গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তাঁর কাজ একটি মৌলিক নৈতিক অবস্থান দৃশ্যমান করে: একজন মানুষ তখনও মানুষ, যখন তার আর সমাজকে কিছু দেওয়ার নেই।
তাঁর উত্তরাধিকার অবশ্যই বিতর্কমুক্ত নয়। Missionaries of Charity পরিচালিত কিছু প্রতিষ্ঠানের চিকিৎসা-মান, ব্যথা উপশম, স্বাস্থ্যবিধি, অর্থায়ন, এবং suffering সম্পর্কে তাঁর ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে সমালোচনা হয়েছে।
এই সমালোচনা আলোচনা করা যেমন জরুরি, তেমনি তাঁকে শুধু ‘সন্ত’ অথবা শুধু ‘প্রতারক’ বানিয়ে ফেলা ইতিহাসকে অতিরিক্ত সরল করে।
সমাজ বদলানো জরুরি। কিন্তু সমাজ বদলানোর অপেক্ষায় সামনে পড়ে থাকা মানুষটির কী হবে?
মালালা ইউসুফজাই
আবার একটি মেয়ের হাতে বই
শতবর্ষের গল্পটি আবার একটি মেয়ের হাতে এসে পৌঁছায়।
একটি বই। একটি স্কুল। আর এমন একটি শক্তি, যারা মনে করে মেয়েটির স্কুলে যাওয়া উচিত নয়।
পাকিস্তানের সোয়াত উপত্যকায় তালেবান প্রভাব বিস্তারের সময় মেয়েদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষার অধিকারের ওপর চাপ বাড়ে।
২০০৯ সালে কিশোরী মালালা ছদ্মনামে BBC Urdu-তে নিজের জীবন ও শিক্ষার আকাঙ্ক্ষা নিয়ে ডায়েরি লিখতে শুরু করেন।
২০১২ সালের ৯ অক্টোবর স্কুল থেকে ফেরার পথে তাঁকে গুলি করা হয়।
তিনি বেঁচে যান। এবং কথা বলা বন্ধ করেননি।
২০১৪ সালে কৈলাশ সত্যার্থীর সঙ্গে যৌথভাবে নোবেল শান্তি পুরস্কার পান। কিন্তু পুরস্কারের চেয়েও বড় প্রশ্নটি ছিল— কেন একটি কিশোরীর হাতে একটি বই এত বিপজ্জনক?
উত্তরটি সম্ভবত ক্ষমতার প্রকৃতির মধ্যেই আছে। শিক্ষা মানুষকে শুধু তথ্য দেয় না। তাকে বিকল্প কল্পনা করতে শেখায়।
যখন তাকে বলা হয়— “তোমার ভাগ্য এটাই”— শিক্ষিত মানুষটি জিজ্ঞেস করতে পারে— “কে ঠিক করেছে?”
মালালাকে নিয়েও রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিতর্ক রয়েছে। তাঁর আন্তর্জাতিক পরিচিতি, পশ্চিমা গণমাধ্যমে তাঁর উপস্থাপন এবং পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে তাঁকে কীভাবে দেখা হয়—এসব নিয়ে নানা মত আছে।
কিন্তু বিতর্কের ভেতরেও একটি ঐতিহাসিক সত্য অপরিবর্তিত: একটি কিশোরীকে মেয়েদের শিক্ষার পক্ষে কথা বলার কারণে গুলি করা হয়েছিল।
রোকেয়ার হাতে যে বইটি ছিল বন্ধ দরজা খোলার প্রতীক, এক শতাব্দী পরে মালালার হাতে সেই বই আবার ফিরে আসে।
দশজন মানুষ—দশ ধরনের প্রতিবাদ
আর মুক্তচিন্তা ও মানবতাবাদের একটি বিস্তৃত মানচিত্র
এখন পেছনে তাকালে একটি অদ্ভুত চিত্র দেখা যায়।
বিদ্যাসাগরের হাতে ছিল আইন ও পাঠ্যপুস্তক। রবীন্দ্রনাথের হাতে ছিল একটি সাম্রাজ্যিক সম্মান ফিরিয়ে দেওয়ার নৈতিক শক্তি। রোকেয়ার হাতে বই ও স্কুল। নজরুলের হাতে কবিতা। আম্বেদকরের হাতে আইন ও সংবিধান। পেরিয়ারের হাতে প্রশ্ন। গফ্ফার খানের হাতে অহিংস সংগঠন। ফয়েজের হাতে কবিতা ও সাংবাদিকতা। তাসলিমার হাতে বিতর্কিত কিন্তু আপসহীন লেখা। মাদার তেরেসার হাতে প্রত্যক্ষ সেবা। মালালার হাতে স্কুলবই।
প্রতিবাদ সবসময় মিছিল নয়।
কখনো বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা প্রতিবাদ। কখনো সংবিধানে সমতার নীতি লেখা। কখনো নিজের রাষ্ট্র বা নিজের সম্প্রদায়ের ভুলের বিরুদ্ধে কথা বলা। কখনো অস্ত্র না তোলা। কখনো নিষিদ্ধ হওয়ার ঝুঁকি নিয়েও লেখা। কখনো সমাজ যাকে আর দেখে না, তাকে মানুষ হিসেবে দেখা।
সত্যিকার শিক্ষা মানুষকে একটি বিপজ্জনক ক্ষমতা দেয়— নিজের মাথায় ভাবার ক্ষমতা।
মুক্তচিন্তা কি শুধু ধর্মবিরোধিতা?
না।
মুক্তচিন্তা হতে পারে রাষ্ট্রকে প্রশ্ন করা, জাতপাতকে প্রশ্ন করা, পুরুষতন্ত্রকে প্রশ্ন করা, নিজের ধর্মীয় বা রাজনৈতিক সম্প্রদায়ের অন্যায়কে প্রশ্ন করা, জাতীয়তাবাদের অন্ধত্বকে প্রশ্ন করা, এমনকি নিজের মতাদর্শকেও প্রশ্ন করা।
মুক্তচিন্তার কঠিনতম পরীক্ষাটি হলো— “আমি ভুল হতে পারি”—এই সম্ভাবনা মেনে নেওয়া।
মানবতাবাদ কি শুধু সহানুভূতি?
এটিও নয়।
মানবতাবাদের পরীক্ষা হয় তখন, যখন বিপন্ন মানুষটি আমার দলের নয়, আমার ধর্মের নয়, আমার জাতের নয়, আমার মতেরও নয়।
মানবতা তখনই গভীর হয়, যখন মানুষের মর্যাদাকে পরিচয়ের আগে রাখা যায়।
দক্ষিণ এশিয়া—এই গল্পের একাদশ চরিত্র
এই দশজনের পেছনে আরেকটি চরিত্র সবসময় উপস্থিত— দক্ষিণ এশিয়া নিজেই।
এক অদ্ভুত ভূখণ্ড, যেখানে প্রাচীন দর্শনের জন্ম হয়েছে, আবার কঠোর জাতপাতও বেঁচে থেকেছে।
যেখানে অসাধারণ কবিতা লেখা হয়েছে, আবার বই নিষিদ্ধও হয়েছে।
যেখানে অহিংস গণআন্দোলনের ইতিহাস আছে, আবার ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক সহিংসতাও।
যেখানে নারী রাষ্ট্র পরিচালনা করেছেন, আবার একই সমাজে একটি মেয়ের পোশাক ও চলাফেরা নিয়েও সিদ্ধান্ত অন্যেরা নিতে চায়।
যেখানে সংবিধানে সমতা লেখা, আবার সামাজিক সম্পর্কের বহু স্তরে জন্মগত পরিচয়ের প্রভাব এখনো প্রবল।
এই contradiction-ই দক্ষিণ এশিয়ার বাস্তবতা।
এই মানুষগুলো বাইরের কেউ নন। তাঁরা এই সমাজেরই সন্তান অথবা এই অঞ্চলকে নিজের কর্মক্ষেত্র বানানো মানুষ।
তাঁদের প্রতিবাদ দক্ষিণ এশিয়ার বিরুদ্ধে নয়; বরং দক্ষিণ এশিয়ার নিজের সঙ্গে নিজের কথোপকথন।
তরুণ প্রজন্মের সামনে নতুন দেয়াল
আজকের তরুণদের সামনে রোকেয়ার সময়ের ঠিক একই সমস্যা নেই। কিন্তু দেয়াল শেষ হয়নি—রূপ বদলেছে।
একসময় তথ্য পাওয়া কঠিন ছিল। এখন সমস্যা তথ্যের বন্যা।
একসময় গ্রামের লোক কী বলবে—এই ভয় ছিল। আজ আছে অনলাইন shame, trolling এবং viral outrage।
একসময় সামাজিক কর্তৃত্বের মুখ ছিল জমিদার, ধর্মীয় নেতা, পরিবারের প্রবীণ কিংবা ঔপনিবেশিক কর্মকর্তা।
এখন তালিকায় নতুন একটি শক্তি এসেছে— অ্যালগরিদম।
আমরা যা পছন্দ করি, অ্যালগরিদম আমাদের আরও সেটিই দেখায়। ধীরে ধীরে মনে হয়— আমার মতো সবাই ভাবে। অন্যরা হয় বোকা, নয় শত্রু।
এই জায়গায় বিদ্যাসাগরের আইনি সংস্কার, রবীন্দ্রনাথের বিশ্বমানবতা, রোকেয়ার শিক্ষা, নজরুলের অসাম্প্রদায়িকতা, আম্বেদকরের সমতার প্রশ্ন, পেরিয়ারের সন্দেহ করার অভ্যাস, গফ্ফার খানের আত্মসংযম, ফয়েজের শিল্পিত প্রতিবাদ, তাসলিমার মতপ্রকাশের বিতর্ক, মাদার তেরেসার প্রত্যক্ষ সহমর্মিতা, এবং মালালার বই— সবগুলোই একসঙ্গে প্রয়োজন।
তাঁদের পূজা নয়—তাঁদের সঙ্গে কথোপকথন
ইতিহাসের বড় মানুষদের নিয়ে আমাদের একটি প্রবণতা আছে।
আমরা তাঁদের প্রথমে মূর্তি বানাই। তারপর প্রশ্ন করা বন্ধ করি।
কিন্তু এই মানুষদের কাউকেই flawless hero হিসেবে দেখা উচিত নয়।
বিদ্যাসাগরের কিছু সামাজিক অবস্থান নিয়ে সমকালীন বিতর্ক ছিল। রবীন্দ্রনাথের সব রাজনৈতিক অনুমান নির্ভুল ছিল না। আম্বেদকরের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক আছে। পেরিয়ারের কিছু বক্তব্য কঠোর সমালোচিত। ফয়েজের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে মতবিরোধ আছে। তাসলিমার ভাষা ও পদ্ধতি নিয়ে গভীর বিতর্ক আছে। মাদার তেরেসার প্রতিষ্ঠান ও দর্শন নিয়েও প্রশ্ন আছে। মালালাকেও রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিকভাবে বিভিন্নভাবে মূল্যায়ন করা হয়।
এগুলো বাদ দিলে ইতিহাস আর ইতিহাস থাকে না।
যে মানুষগুলো প্রশ্ন করার জন্য স্মরণীয়, তাঁদের স্মৃতিকেই যদি প্রশ্নের বাইরে রাখা হয়, তবে সেটিই হবে তাঁদের উত্তরাধিকারের সঙ্গে সবচেয়ে বড় বিরোধ।
এবার প্রশ্ন করার পালা কার?
আবার সেই রাতের তরুণীর কাছে ফিরে যাই।
মোবাইলের পর্দা এখনো তার হাতে। খবরগুলো বদলায়নি।
যুদ্ধ আছে। বৈষম্য আছে। নারী নির্যাতন আছে। সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ আছে। ক্ষমতার অপব্যবহার আছে। ভুয়া খবর আছে।
কিন্তু একটি জিনিস বদলেছে— তার চোখ।
সে এখন জানে, অন্যায় নতুন নয়।
কিন্তু প্রতিবাদও নতুন নয়।
তার আগে কেউ বিধবা বিবাহ আইন এনেছিলেন। কেউ একটি সম্মান ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। কেউ একটি মেয়েদের স্কুল খুলেছিলেন। কেউ কবিতাকে বিদ্রোহে পরিণত করেছিলেন। কেউ জন্মগত অপমানকে সংবিধানের ভাষায় জবাব দিয়েছিলেন। কেউ হাজার বছরের বিশ্বাসকে প্রশ্ন করেছিলেন। কেউ অস্ত্র ছাড়াই আন্দোলন গড়েছিলেন। কেউ কারাগারের ভেতর থেকেও লিখেছিলেন। কেউ লেখার মূল্য হিসেবে নির্বাসন বহন করেছেন। কেউ রাস্তার পাশে পড়ে থাকা মানুষকে তুলে নিয়েছিলেন। কেউ গুলিবিদ্ধ হয়েও স্কুলবই ছাড়েননি।
তরুণীটি ফোনটি নামিয়ে রাখে।
পরদিন পৃথিবী অলৌকিকভাবে বদলে যাবে না। তার হাতে রাষ্ট্র নেই। ক্ষমতা নেই। বড় কোনো সংগঠনও হয়তো নেই।
কিন্তু এখন তার কাছে একটি জিনিস আছে—
একটি প্রশ্ন।
আর ইতিহাস বলে, অনেক বড় পরিবর্তন ঠিক এখান থেকেই শুরু হয়েছে।
“কেন?”
তারপর— “কেন নয়?”
তারপর— “এভাবে চলতেই হবে কে বলেছে?”
একশ বছর পর কেউ যখন আমাদের সময়ের ইতিহাস লিখবে, ভবিষ্যতের কোনো তরুণ হয়তো জানতে চাইবে—
আমরা কি শুধু স্ক্রল করেছিলাম?
আমরা কি নিজের পক্ষের অন্যায়কে ন্যায় বলে ব্যাখ্যা করেছিলাম?
আমরা কি সত্য যাচাই না করেই ঘৃণা ছড়িয়েছিলাম?
নাকি আমাদের মধ্যেও কেউ একটি স্কুল খুলেছিল? একটি গবেষণা করেছিল? একটি সত্য লিখেছিল? একটি অন্যায্য আইন বদলাতে চেষ্টা করেছিল? শত্রুকেও মানুষ বলতে অস্বীকার করেনি? একটি মেয়ের হাতে বই তুলে দিয়েছিল?
ইতিহাসের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন সম্ভবত “আমাদের আগে কারা সাহসী ছিলেন?” নয়।
বরং—
তাঁদের গল্প জানার পর আমরা কী করলাম?
বিদ্যাসাগর আমাদের হয়ে আর আইন আনবেন না। রোকেয়া আমাদের হয়ে আবার স্কুল খুলবেন না। নজরুল আমাদের হয়ে প্রতিবাদের কবিতা লিখবেন না। আম্বেদকর আমাদের হয়ে নতুন করে সামাজিক সমতা প্রতিষ্ঠা করবেন না। পেরিয়ার আমাদের হয়ে প্রশ্ন করবেন না। গফ্ফার খান আমাদের রাগ নিয়ন্ত্রণ করবেন না। ফয়েজ আমাদের হয়ে স্বাধীনতার ভাষা নির্মাণ করবেন না। তাসলিমা আমাদের হয়ে মতপ্রকাশের ঝুঁকি নেবেন না। মাদার তেরেসা আমাদের সামনে পড়ে থাকা মানুষটিকে তুলে নেবেন না। মালালা আমাদের হয়ে বই হাতে দাঁড়াবেন না।
সেই দায়িত্ব এখন জীবিতদের।
অর্থাৎ— আমাদের।
ইতিহাসের পরবর্তী অধ্যায়টি এখনো লেখা হয়নি।

No comments:
Post a Comment
Please validate CAPTCHA