Skip to main content
Breaking NewsDeveloping public-interest story

Latest

Thursday, August 20, 2026

Reading time

তালেবানের হাতে ৬ মানবাধিকার কর্মী জোরপূর্বক গুম — নারী অধিকার দমনের হাতিয়ার হিসেবে গুম

 

আফগানিস্তানজোরপূর্বক গুমনারী অধিকারWCLRF

আফগানিস্তান: তালেবানের হাতে ৬ মানবাধিকার কর্মী জোরপূর্বক গুম — নারী অধিকার দমনের হাতিয়ার হিসেবে গুম

মিনহাজ সামাদ চৌধুরী
মিনহাজ সামাদ চৌধুরী
Minhaz Samad Chowdhury
Independent Human Rights Defender and Governance and Public Policy Analyst
১৪ আগস্ট ২০২৬পাঠের সময়: ৮ মিনিট

কাবুলে নারী ও শিশুদের আইনি সহায়তা প্রদানকারী সংস্থা উইমেন অ্যান্ড চিলড্রেন লিগ্যাল রিসার্চ ফাউন্ডেশন (Women and Children Legal Research Foundation - WCLRF) এর ছয়জন পুরুষ কর্মীকে তালেবান কর্তৃপক্ষ জোরপূর্বক গুম করেছে। এই ঘটনা শুধু ছয়টি পরিবারের ট্র্যাজেডি নয় — এটি আফগানিস্তানে নারী অধিকার রক্ষার শেষ প্রদীপগুলো নিভিয়ে দেওয়ার একটি সুপরিকল্পিত কৌশল।

তথ্যসূত্র:Human Rights Watch প্রতিবেদন — ১৩ আগস্ট ২০২৬|WCLRF কাবুল অফিস
I

ঘটনার সারসংক্ষেপ

আফগানিস্তানে নারীদের জন্য ন্যায়বিচারের প্রবেশাধিকার প্রায় বিলুপ্ত। সেই শূন্যতায় কাজ করে আসছিল WCLRF — পারিবারিক সহিংসতা, বাল্যবিবাহ, সম্পত্তির অধিকার এবং শিশু সুরক্ষা নিয়ে আইনি গবেষণা ও সহায়তা প্রদানকারী একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান।

ঘটনাপ্রবাহজুন – আগস্ট ২০২৬
২১ জুন ২০২৬

WCLRF অফিসে অভিযান

তালেবানের গোয়েন্দা সংস্থা (General Directorate of Intelligence - GDI) কাবুলে WCLRF এর অফিসে অভিযান চালায়। অফিস সিলগালা করা হয়, সকল ল্যাপটপ, মোবাইল ফোন ও নথিপত্র জব্দ করা হয় এবং উপস্থিত কর্মীদের দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।

১৮ জুলাই ২০২৬

প্রতারণার ফাঁদে ডেকে গুম

ছয়জন পুরুষ কর্মীকে ফোন করে জানানো হয় তাদের জব্দকৃত ডিভাইস ফেরত দেওয়া হবে। তারা নির্ধারিত স্থানে গেলে তাদের আটক করা হয়। এরপর থেকে প্রায় এক মাস ধরে তাদের অবস্থান, ভাগ্য বা আইনি অবস্থা সম্পর্কে পরিবারকে কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি।

১৩ আগস্ট ২০২৬

HRW কর্তৃক প্রকাশ

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (Human Rights Watch - HRW) এই জোরপূর্বক গুমের ঘটনা প্রকাশ করে এবং অবিলম্বে মুক্তির দাবি জানায়। সংস্থাটি জানায়, পরিবারগুলো চরম উদ্বেগ ও ভয়ের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে।

গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট: তালেবান কর্তৃপক্ষ WCLRF এর নারী কর্মীদের সরাসরি আটক না করে পুরুষ সহকর্মীদের লক্ষ্যবস্তু করেছে — এটি একটি কৌশলগত বার্তা যে, নারীদের সহায়তা করাও এখন শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

II

মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিশ্লেষণ

১. জোরপূর্বক গুম কী এবং কেন এটি ভয়াবহ?

আন্তর্জাতিক আইনে জোরপূর্বক গুম (Enforced Disappearance) বলতে বোঝায় — রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রের সমর্থনে কোনো ব্যক্তিকে আটক, অপহরণ বা স্বাধীনতা হরণের পর তার ভাগ্য বা অবস্থান গোপন রাখা এবং আইনি সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত করা। এই ছয়জনের ক্ষেত্রে ঠিক তাই ঘটেছে: আটকের স্বীকারোক্তি নেই, অবস্থান গোপন, পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন, আদালতে হাজির করা হয়নি।

আইনি প্রভাব: এটি শুধু ব্যক্তিগত স্বাধীনতার লঙ্ঘন নয়, এটি নির্যাতনের (torture) সমতুল্য — গুম হওয়া ব্যক্তি এবং তার পরিবার উভয়ের জন্যই। জাতিসংঘের ওয়ার্কিং গ্রুপ অন এনফোর্সড ডিসঅ্যাপিয়ারেন্স এটিকে একটি চলমান অপরাধ হিসেবে গণ্য করে।

২. অধিকার রক্ষার অধিকারের উপর হামলা

WCLRF এর কর্মীরা মানবাধিকার রক্ষক (Human Rights Defenders)। তাদের কাজ ছিল নারী ও শিশুদের আইনি অধিকার রক্ষা করা। তাদের উপর এই আক্রমণ জাতিসংঘ ঘোষিত Declaration on Human Rights Defenders এর সরাসরি লঙ্ঘন।

তালেবান নারী ও মেয়েদের সহায়তার যেকোনো প্রচেষ্টাকেই তাদের নিপীড়নমূলক শাসনের জন্য হুমকি মনে করে।

— ম্যাকারেনা সায়েজ (Macarena Sáez), নারী অধিকার বিভাগ পরিচালক, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ

৩. লিঙ্গভিত্তিক নিপীড়ন

আগস্ট ২০২১ থেকে তালেবান শাসনে আফগান নারীদের উপর যে পদ্ধতিগত নিপীড়ন চলছে, এই গুম তারই সম্প্রসারণ:

  • ষষ্ঠ শ্রেণির পর মেয়েদের শিক্ষা নিষিদ্ধ
  • নারীদের অধিকাংশ কর্মক্ষেত্র থেকে বহিষ্কার, চলাফেরায় মাহরাম বাধ্যতামূলক
  • বাল্যবিবাহের ন্যূনতম বয়সসীমা বাতিল
  • পারিবারিক সহিংসতা তখনই শাস্তিযোগ্য যখন হাড় ভাঙে — এর কমে নয়

তাদের পরিবারগুলো ক্রমাগত ভয় ও অনিশ্চয়তার মধ্যে বসবাস করছে।

— জারকা ইয়াফতালি (Zarqa Yaftali), আফগান নারী অধিকার কর্মী ও WCLRF এর সাবেক প্রধান
III

সুশাসন ও প্রশাসনিক প্রভাব

এই ঘটনাটি আফগানিস্তানে সুশাসনের সম্পূর্ণ ভাঙনকে প্রকাশ করে। যখন একটি বৈধ গবেষণা প্রতিষ্ঠানের অফিস কোনো পরোয়ানা ছাড়া সিলগালা করা হয়, ডিভাইস জব্দ করা হয় এবং কর্মীদের প্রতারণার মাধ্যমে ডেকে গুম করা হয় — তখন সেখানে আইনের শাসনের কোনো অস্তিত্ব থাকে না।

প্রশাসনিক বার্তা

নাগরিক সমাজকে বার্তা দেওয়া হচ্ছে — নারী অধিকার নিয়ে কাজ করলে পরিণতি হবে গুম। এটি ভয়ের মাধ্যমে শাসন (rule by fear)।

প্রাতিষ্ঠানিক ধ্বংস

WCLRF এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো ছিল আফগান বিচার ব্যবস্থার শেষ ভরসা। তাদের ধ্বংস মানে নারীদের জন্য ন্যায়বিচারের দরজা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাওয়া।

এই ধরনের গুম বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, তথ্যের অধিকার এবং সংগঠনের স্বাধীনতাকে সরাসরি আঘাত করে। যখন মানবাধিকার কর্মীরা নিজেরাই নিরাপদ নন, তখন সাধারণ নারীরা কার কাছে যাবেন?

IV

আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামো

তালেবান কর্তৃপক্ষ আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার না হলেও, আফগানিস্তান রাষ্ট্র হিসেবে বহু আন্তর্জাতিক চুক্তিতে আবদ্ধ এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন সকল কর্তৃপক্ষের জন্য প্রযোজ্য।

ICPPED
জোরপূর্বক গুমকে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে নিষিদ্ধ করে। কোনো পরিস্থিতিতেই এটি জায়েজ নয়।
ICCPR অনুচ্ছেদ ৯ ও ১৬
International Covenant on Civil and Political Rights
স্বেচ্ছাচারী আটক নিষিদ্ধ এবং প্রত্যেক ব্যক্তির আইনের সামনে ব্যক্তি হিসেবে স্বীকৃতির অধিকার নিশ্চিত করে।
CEDAW
নারীর প্রতি সকল বৈষম্য দূরীকরণে রাষ্ট্রকে বাধ্য করে। WCLRF কে লক্ষ্যবস্তু করা এই চুক্তির চেতনার পরিপন্থী।
CRC
শিশুদের সুরক্ষায় কাজ করা সংস্থাকে দমন করা শিশু অধিকারের লঙ্ঘন।
HRC স্বাধীন তদন্ত ব্যবস্থা
Human Rights Council Independent Mechanism - অক্টোবর ২০২৫
আফগানিস্তানে মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রমাণ সংগ্রহ ও সংরক্ষণের জন্য গঠিত। এই গুমের ঘটনা তার আওতায় পড়ে।

জাতিসংঘ সতর্কতা: ২০২৫ সালের আগস্টে জাতিসংঘের ওয়ার্কিং গ্রুপ অন ডিসক্রিমিনেশন অ্যাগেইনস্ট উইমেন অ্যান্ড গার্লস সতর্ক করে বলেছিল — আফগানিস্তানে লিঙ্গভিত্তিক নিপীড়ন মানবতাবিরোধী অপরাধের পর্যায়ে পৌঁছেছে এবং জেন্ডার অ্যাপারথাইড হিসেবে স্বীকৃত হওয়া উচিত।

V

করণীয় — অবিলম্বে পদক্ষেপ প্রয়োজন

Call to Action

এই ছয়জন কর্মীর জীবন এখন ঝুঁকিতে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নীরবতা তালেবানকে আরও দমন-পীড়নে উৎসাহিত করবে। নিচের পদক্ষেপগুলো অবিলম্বে নেওয়া প্রয়োজন।

তালেবান কর্তৃপক্ষের প্রতি

  • ছয়জন WCLRF কর্মীকে অবিলম্বে ও নিঃশর্তে মুক্তি দিতে হবে এবং তাদের অবস্থান পরিবারকে জানাতে হবে
  • WCLRF অফিসের সিলগালা তুলে নিতে হবে, জব্দকৃত ডিভাইস ও নথি ফেরত দিতে হবে
  • মানবাধিকার কর্মী, নারী অধিকার সংগঠন ও আইনি সহায়তা প্রদানকারীদের বিরুদ্ধে সকল হয়রানি ও প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা বন্ধ করতে হবে
  • জোরপূর্বক গুম একটি আন্তর্জাতিক অপরাধ — এর দায় ব্যক্তিগতভাবে বর্তাবে

জাতিসংঘের প্রতি

  • UNAMA এবং মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারকে এই গুমের ঘটনা প্রকাশ্যে নিন্দা জানাতে হবে
  • ওয়ার্কিং গ্রুপ অন এনফোর্সড ডিসঅ্যাপিয়ারেন্সকে জরুরি হস্তক্ষেপ (urgent appeal) পাঠাতে হবে
  • HRC স্বাধীন তদন্ত ব্যবস্থাকে (অক্টোবর ২০২৫) এই ঘটনাকে প্রমাণ হিসেবে সংরক্ষণ করতে হবে
  • নিরাপত্তা পরিষদকে আফগানিস্তানে মানবাধিকার রক্ষকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে বিশেষ ব্রিফিং আহ্বান করতে হবে

সরকারগুলোর প্রতি — EU, জার্মানি, ইরান, পাকিস্তান

  • EU: ২২ জুন ২০২৬ ব্রাসেলসে তালেবান প্রতিনিধিদলের সঙ্গে অভিবাসন আলোচনায় মানবাধিকারকে শর্ত হিসেবে যুক্ত করতে হবে। অভিবাসন সহযোগিতার নামে নিপীড়কদের বৈধতা দেওয়া যাবে না
  • জার্মানি: আগস্ট ২০২৪ থেকে শুরু হওয়া আফগান নাগরিকদের জোরপূর্বক ফেরত পাঠানোর ফ্লাইট স্থগিত করতে হবে, বিশেষ করে নারী ও মানবাধিকার কর্মীদের ক্ষেত্রে
  • ইরান ও পাকিস্তান: আফগান শরণার্থীদের জোরপূর্বক ফেরত পাঠানো বন্ধ করতে হবে — ফেরত পাঠানো মানে তালেবানের হাতে তুলে দেওয়া
  • সকল দাতা দেশকে WCLRF এর মতো সংগঠনের কর্মী ও পরিবারের জন্য জরুরি ভিসা ও সুরক্ষা ব্যবস্থা চালু করতে হবে

দাতা ও নাগরিক সমাজের প্রতি

  • WCLRF ও অন্যান্য আফগান নারী নেতৃত্বাধীন সংগঠনগুলোকে নমনীয় ও নিরাপদ তহবিল প্রদান করতে হবে
  • গুম হওয়া কর্মীদের পরিবারের আইনি ও মানসিক সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে
  • আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে এই ঘটনার ধারাবাহিক কভারেজ বজায় রাখতে হবে — বিস্মৃতিই তালেবানের সবচেয়ে বড় অস্ত্র
VI

উপসংহার

ছয়জন মানবাধিকার কর্মীর গুম কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি আফগানিস্তানে নারী অধিকার ও আইনের শাসনের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধের একটি নতুন অধ্যায়। তালেবান যখন মেয়েদের স্কুল বন্ধ করে, নারীদের কাজ থেকে বহিষ্কার করে, বাল্যবিবাহকে বৈধতা দেয় — তখন WCLRF এর মতো সংগঠনগুলোই ছিল শেষ আশ্রয়।

এখন সেই আশ্রয়কেও গুম করা হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যদি এখনই স্পষ্ট বার্তা না দেয় যে জোরপূর্বক গুম এবং নারী অধিকার কর্মীদের দমন গ্রহণযোগ্য নয়, তবে কাল আরও ছয়জন, পরশু আরও ষাটজন গুম হবেন। আফগান নারীরা আরও অন্ধকারে তলিয়ে যাবেন।

আমরা ছয়জন WCLRF কর্মীর অবিলম্বে মুক্তি, তাদের নিরাপত্তা এবং আফগানিস্তানে মানবাধিকার রক্ষকদের সুরক্ষার দাবি জানাই। নীরবতা কোনো বিকল্প নয়।

মিনহাজ সামাদ চৌধুরী
লেখক সম্পর্কে
মিনহাজ সামাদ চৌধুরী
Minhaz Samad Chowdhury

স্বাধীন মানবাধিকার রক্ষক এবং সুশাসন ও পাবলিক পলিসি বিশ্লেষক। আফগানিস্তান, দক্ষিণ এশিয়া ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ব্যবস্থা নিয়ে কাজ করেন। নারী অধিকার, জোরপূর্বক গুম এবং নাগরিক সমাজের সুরক্ষা তার গবেষণার মূল ক্ষেত্র।

এই নিবন্ধটি জনস্বার্থে এবং মানবাধিকার সচেতনতার জন্য প্রকাশিত। তথ্যসূত্র: Women and Children Legal Research Foundation (WCLRF), Human Rights Watch (13 August 2026), UN Working Group on Discrimination Against Women and Girls, Human Rights Council Independent Mechanism।
© ২০২৬ মিনহাজ সামাদ চৌধুরী। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।

No comments:

Post a Comment

Please validate CAPTCHA