জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা (সন্তু লারমা):
জীবন, নেতৃত্ব ও শান্তিচুক্তির
অসমাপ্ত উত্তরাধিকার
An Independent Analysis by Minhaz Samad Chowdhury, Independent Human Rights Defender and Governance & Public Policy Analyst (মানবাধিকার রক্ষাকর্মী ও সুশাসন এবং পাবলিক পলিসি বিশ্লেষক)
পাঠকের জন্য প্রারম্ভিক ঘোষণা
এই নিবন্ধটি একটি সাধারণ তথ্য-বিশ্লেষণী প্রয়াস; এটি কোনো আইনি বা রাজনৈতিক পরামর্শ নয়। পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনীতি নিয়ে বাংলাদেশে ভিন্নমত ও বিতর্ক আছে — এই লেখায় সেই বিতর্ক এড়িয়ে না গিয়ে সরাসরি তুলে ধরা হয়েছে। সন্তু লারমার রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে সমর্থক ও সমালোচক উভয় পক্ষের বয়ান পাশাপাশি উপস্থাপন করা হয়েছে, যাতে পাঠক নিজে তথ্য যাচাই করে বিচার করতে পারেন। রাষ্ট্রীয় নথি, জাতিসংঘের বিবৃতি এবং স্বাধীন প্রতিবেদনের ভিত্তিতে লেখাটি তৈরি।
পার্বত্য চট্টগ্রামের আধুনিক রাজনৈতিক ইতিহাস লিখতে গেলে জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা — সন্তু লারমা নামে সমধিক পরিচিত — এই নামটি এড়িয়ে যাওয়া যায় না। প্রায় ছয় দশক ধরে তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনীতির কেন্দ্রে রয়েছেন: প্রথমে ছাত্র সংগঠক, পরে সশস্ত্র আন্দোলনের নেতা, তারপর শান্তিচুক্তির অন্যতম স্বাক্ষরকারী, এবং সবশেষে পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের দীর্ঘমেয়াদি চেয়ারম্যান।
তাঁর জীবনকে কেবল ব্যক্তি-জীবনী হিসেবে না দেখে একটি জনগোষ্ঠীর রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের দীর্ঘ আলোচনার দলিল হিসেবে দেখাই বেশি অর্থবহ। এই দলিলে ব্যক্তিগত ত্যাগ, সাংগঠনিক ধারাবাহিকতা, রাষ্ট্রীয় প্রতিশ্রুতি এবং সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের ঘাটতি — সবকিছুই একসূত্রে গাঁথা।
পারিবারিক পটভূমি ও শিক্ষাজীবন
সন্তু লারমার জন্ম ১৯৪৪ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি, রাঙামাটির নানিয়ারচর উপজেলার একটি গ্রামে, চাকমা পরিবারে। তাঁর পিতা চিত্ত কিশোর চাকমা এবং মাতা সুভাষিণী দেওয়ান। চার ভাইবোনের মধ্যে সবচেয়ে ছোট সন্তু লারমা তাঁর বড় ভাই মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা (এম. এন. লারমা)-র ছায়াতেই রাজনৈতিক চেতনায় বেড়ে ওঠেন — যিনি নিজে পার্বত্য চট্টগ্রামের ইতিহাসে জাতীয় সংসদে জুম্ম জনগোষ্ঠীর অধিকারের প্রশ্ন তোলা প্রথম নেতাদের একজন হিসেবে পরিচিত এবং যাঁকে অনেকে পার্বত্য রাজনীতির সাংবিধানিক ভিত্তি স্থাপনকারী হিসেবে দেখেন।
শিক্ষাজীবনে তিনি রাঙামাটি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, চট্টগ্রামের সরকারি সিটি কলেজের পূর্বসূরি প্রতিষ্ঠান, কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ষাটের দশকের শুরুতেই তিনি ইস্ট পাকিস্তান স্টুডেন্টস ইউনিয়ন-এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে ছাত্র-রাজনীতিতে প্রবেশ করেন — যে সময়টা পূর্ব পাকিস্তানের সামগ্রিক রাজনৈতিক জাগরণ, ভাষা-আন্দোলন পরবর্তী সাংস্কৃতিক চেতনা এবং স্বায়ত্তশাসনের দাবির সময়ও বটে। এই ছাত্র-রাজনীতির অভিজ্ঞতা পরবর্তীতে তাঁর সাংগঠনিক দক্ষতার ভিত্তি তৈরি করে।
শিক্ষকতা পেশায় (১৯৬৬–৭৪) তাঁর ভূমিকা বিশেষভাবে লক্ষণীয়। তিনি মাইসছড়ি, গুইমারা ও দিঘীনালার স্কুলে শিক্ষকতার পাশাপাশি পার্বত্য চট্টগ্রাম জুম্ম শিক্ষক সমিতি গঠনে নেতৃত্ব দেন। এই পর্যায়টি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এখান থেকেই বোঝা যায় তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের একটি ভিত্তি — শিক্ষাকে জনগোষ্ঠীর সাংগঠনিক শক্তি হিসেবে দেখা এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে সচেতনতা তৈরির মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা। শিক্ষক হিসেবে তিনি সরাসরি মাঠ পর্যায়ে জুম্ম সমাজের ভূমি, ভাষা ও সংস্কৃতি হারানোর আশঙ্কা প্রত্যক্ষ করেন, যা পরবর্তী রাজনৈতিক অবস্থানের নৈতিক ভিত্তি হয়ে ওঠে।
রাজনৈতিক উত্থান ও সশস্ত্র সংগ্রামের কাল
১৯৭২ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (পিসিজেএসএস/জেএসএস) প্রতিষ্ঠার সময় সন্তু লারমা প্রতিষ্ঠাতা নেতৃত্বের অংশ হন। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরপরই সংবিধানে পার্বত্য চট্টগ্রামের স্বতন্ত্র জাতিসত্তার স্বীকৃতি না মেলা, আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের দাবি উপেক্ষিত হওয়া এবং ভূমি-অধিকার সংক্রান্ত গভীর অসন্তোষ থেকে এই সংগঠনের জন্ম। ১৯৭৩ সালে জেএসএস-এর সশস্ত্র শাখা শান্তি বাহিনী গঠিত হয়, যা প্রায় দুই দশক ধরে রাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে থাকে — এটি বাংলাদেশের স্বাধীনতা-উত্তর ইতিহাসের দীর্ঘতম অভ্যন্তরীণ সংঘাতগুলোর একটি।
এই পর্বে সন্তু লারমার ভূমিকা নিয়ে ইতিহাসবিদ ও বিশ্লেষকদের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ মতভেদ রয়েছে, যা একটি নিরপেক্ষ বিশ্লেষণে এড়িয়ে যাওয়া উচিত নয়। তাঁকে বোঝার জন্য উভয় বয়ানই শোনা জরুরি।
- সন্তু লারমাকে দেখা হয় দীর্ঘ সংগ্রামের একজন অবিচল নেতা হিসেবে, যিনি কারাবরণ, আত্মগোপন ও নির্বাসনের মধ্য দিয়েও আন্দোলন অব্যাহত রাখেন।
- ভাই এম. এন. লারমার মৃত্যুর (১৯৮৩) পর সংগঠনের নেতৃত্বের শূন্যতা পূরণ করে তিনি জেএসএস-কে বিভাজনের হাত থেকে রক্ষা করেন এবং শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার টেবিলে নিয়ে আসেন।
- ১৯৯৭ সালের শান্তিচুক্তিকে তাঁর নেতৃত্বের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক অর্জন হিসেবে উপস্থাপন করা হয় — যা সংঘাত থেকে সংলাপে উত্তরণের দৃষ্টান্ত।
- কিছু গবেষণা ও প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে, ১৯৭৫ ও পরবর্তী গ্রেপ্তার-মুক্তির পর্বে তাঁর সিদ্ধান্ত সামরিক প্রতিরোধ দুর্বল করেছিল এবং বসতি-স্থাপন কর্মসূচি এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করেছিল।
- জেএসএস-এর অভ্যন্তরীণ বিভাজন (যার একটি পরিণতি ইউপিডিএফ গঠন) এবং উভয় পক্ষের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী রক্তক্ষয়ী সংঘাতের জন্য সমালোচকরা সন্তু লারমার কেন্দ্রীভূত নেতৃত্বকেও দায়ী করেন।
- কিছু মহল তাঁকে "রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আপসকামী" হিসেবে চিহ্নিত করে, যদিও জেএসএস নিজে এই অভিযোগ জোরালোভাবে প্রত্যাখ্যান করে।
এই দুই বয়ানের কোনোটিই একতরফাভাবে "সত্য" বলে নিশ্চিতভাবে রায় দেওয়া এই নিবন্ধের উদ্দেশ্য নয়। পার্বত্য চট্টগ্রামের রাজনীতি এখনো জীবন্ত ও বিভাজিত একটি ক্ষেত্র — জেএসএস, ইউপিডিএফ ও তাদের উপদল, রাষ্ট্র, এবং সাধারণ জুম্ম জনগোষ্ঠীর মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন স্বার্থ, স্মৃতি ও অভিজ্ঞতা কাজ করে। একজন সুশাসন-বিশ্লেষকের কাজ হলো এই বহুস্বরকে দমন না করে পাঠকের সামনে তুলে ধরা, যাতে rule of law ও verification-এর ভিত্তিতে পাঠক নিজে বিচার করতে পারেন।
১৯৯৭ সালের শান্তিচুক্তি: প্রক্রিয়া ও তাৎপর্য
নব্বইয়ের দশকের গোড়া থেকে সন্তু লারমার নেতৃত্বে জেএসএস প্রতিনিধিদল সরকারের সঙ্গে দীর্ঘ, বহু-পর্বের আলোচনায় অংশ নেয়। খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও ঢাকায় একাধিক দফা বৈঠক, আস্থা তৈরির উদ্যোগ এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের অনানুষ্ঠানিক সম্পৃক্ততার মধ্য দিয়ে এই প্রক্রিয়া এগোয়। এই আলোচনার ফসল হিসেবে ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর স্বাক্ষরিত হয় পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি — সরকারের পক্ষে আবুল হাসনাত আবদুল্লাহ এবং জেএসএস-এর পক্ষে সন্তু লারমা স্বাক্ষর করেন।
চুক্তির মূল কাঠামো ছিল চারটি ভাগে বিভক্ত এবং এতে অন্তর্ভুক্ত ছিল: একটি আঞ্চলিক পরিষদ গঠন, তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের ক্ষমতা সম্প্রসারণ, সামরিক ক্যাম্প প্রত্যাহার, উদ্বাস্তু পুনর্বাসন এবং একটি ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন গঠনের অঙ্গীকার। আইনি কাঠামোতে এর সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রতিফলন ঘটে ১৯৯৮ সালে পার্লামেন্টে পাস হওয়া "পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ আইন"-এর মধ্য দিয়ে।
এই চুক্তি সেসময় আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল — দক্ষিণ এশিয়ায় বিরল একটি ঘটনা, যেখানে দীর্ঘমেয়াদি সশস্ত্র সংঘাতের অবসান আলোচনার টেবিলে হয়েছিল, যুদ্ধক্ষেত্রে নয়। Peace Accords Matrix অনুযায়ী, এটি negotiation-based settlement-এর একটি অনুকরণীয় মডেল হিসেবে নথিভুক্ত হয়, যদিও implementation gap নিয়ে শুরু থেকেই প্রশ্ন ছিল।
ঘটনাক্রম · TIMELINE
সংবিধানে স্বীকৃতি না পাওয়ার প্রতিক্রিয়ায় এম. এন. লারমার নেতৃত্বে সংগঠন গঠন। সন্তু লারমা প্রতিষ্ঠাতা নেতৃত্বে।
রাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সশস্ত্র সংঘাতের সূচনা।
নেতৃত্বের শূন্যতা পূরণ। জেএসএস-এর পুনর্গঠন ও ঐক্য ধরে রাখার চ্যালেঞ্জ।
আবুল হাসনাত আবদুল্লাহ ও সন্তু লারমা স্বাক্ষর করেন। ৪-খণ্ড বিশিষ্ট চুক্তি।
সংসদে আইন পাস; প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর আইনি ভিত্তি।
সন্তু লারমা চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ; রাষ্ট্রমন্ত্রীর পদমর্যাদা।
জাতীয় পরিসরে আদিবাসী অধিকার আন্দোলনে সভাপতির দায়িত্ব।
UN Special Rapporteur Francisco Cali Tzay চুক্তি বাস্তবায়ন না হওয়ায় সংস্কৃতি ও মানবাধিকার হুমকির কথা বলেন।
রজতজয়ন্তী অনুষ্ঠানে সন্তু লারমা পরিষদকে ইচ্ছাকৃতভাবে নিষ্ক্রিয় রাখার অভিযোগ তোলেন।
নীতি অপরিবর্তিত থাকার সমালোচনা; কোটা-বিরোধিতা ও "আদিবাসী" পরিচয় নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক।
আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান হিসেবে ভূমিকা
১৯৯৯ সালের ২৭ মে থেকে সন্তু লারমা পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান — একটি পদ যা চুক্তি অনুযায়ী রাষ্ট্রমন্ত্রীর মর্যাদাসম্পন্ন। এই দীর্ঘ মেয়াদ — প্রায় সাড়ে দুই দশকেরও বেশি — বাংলাদেশের যেকোনো প্রাতিষ্ঠানিক পদের নিরিখে ব্যতিক্রমী। এই সময়ে তাঁর রাজনৈতিক ভূমিকা আন্দোলন-কেন্দ্রিক থেকে প্রাতিষ্ঠানিক-প্রশাসনিক দিকে সরে যায়। তিনি এখন আর পাহাড়ের গেরিলা নেতা নন, বরং একটি সংবিধিবদ্ধ পরিষদের প্রধান হিসেবে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভেতর থেকে অধিকার বাস্তবায়নের দাবি তোলেন।
তবে এই রূপান্তরই একইসঙ্গে তাঁর নেতৃত্বের সবচেয়ে বিতর্কিত দিক। পরিষদ কতটা কার্যকরভাবে ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পেরেছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েই গেছে। চুক্তিতে পরিষদকে সমন্বয়, তত্ত্বাবধান এবং তিন জেলা পরিষদের কার্যক্রমে নীতিগত দিকনির্দেশনার ক্ষমতা দেওয়ার কথা থাকলেও, বাস্তবে ভূমি প্রশাসন, পুলিশ ও বন-ব্যবস্থাপনার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ক্ষমতা হস্তান্তর সীমিত থেকে গেছে। একাধিক স্বাধীন গবেষণায় "de jure power আছে, de facto control নেই" — এই ফাঁকটি বারবার চিহ্নিত হয়েছে।
২০২৪ সালে পরিষদের রজতজয়ন্তী অনুষ্ঠানেই সন্তু লারমা নিজে স্বীকার করেন যে পরিষদকে দীর্ঘদিন ইচ্ছাকৃতভাবে নিষ্ক্রিয় রাখা হয়েছে বলে তিনি মনে করেন। এই আত্ম-সমালোচনা তাৎপর্যপূর্ণ — এটি একদিকে রাষ্ট্রীয় অনীহার অভিযোগ, অন্যদিকে নিজের দীর্ঘ মেয়াদে প্রাতিষ্ঠানিক অকার্যকারিতার দায়ও পরোক্ষভাবে স্বীকার করে নেওয়া। সমালোচকরা প্রশ্ন তোলেন, দীর্ঘ মেয়াদে চেয়ারম্যান পদে থাকা সত্ত্বেও কেন পরিষদকে কার্যকর করার জন্য আরও জোরালো আইনি ও রাজনৈতিক লড়াই গড়ে তোলা যায়নি।
জাতীয় পরিসরে আদিবাসী অধিকার আন্দোলন
সন্তু লারমার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পার্বত্য চট্টগ্রামেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। ২০০০ সালে বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরাম গঠনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তিনি দেশের অন্যান্য আদিবাসী জনগোষ্ঠী — সাঁওতাল, গারো, খাসিয়া, ম্রো, তঞ্চঙ্গ্যা সহ প্রায় ৫০টির বেশি জনগোষ্ঠীর ভূমি, সাংস্কৃতিক পরিচয় ও রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নেও সরব থেকেছেন। ফোরামের সভাপতি হিসেবে তিনি আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস, ভূমি দখল-বিরোধী আন্দোলন এবং সংবিধানে আদিবাসী স্বীকৃতির দাবিতে জাতীয় পর্যায়ে লবি করেছেন।
মানবাধিকার পরিস্থিতি, ভূমি বেদখল এবং তথাকথিত "উন্নয়ন" প্রকল্পের নামে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর স্বার্থ উপেক্ষিত হওয়া নিয়ে তিনি নিয়মিত সরকারের সমালোচনা করে এসেছেন। বিশেষত পর্যটন, রাবার বাগান ও সংরক্ষিত বন ঘোষণার নামে জুম চাষিদের উচ্ছেদের অভিযোগগুলোতে তিনি রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন দর্শনের সঙ্গে আদিবাসী অধিকারের সংঘাতকে সামনে আনেন। তাঁর এই অবস্থান তাঁকে জাতীয় মানবাধিকার সম্প্রদায়ের কাছে গ্রহণযোগ্য করেছে, আবার একইসঙ্গে রাষ্ট্রীয় মহলে "বিচ্ছিন্নতাবাদী" তকমা পুনরুজ্জীবিত করার ঝুঁকিও তৈরি করেছে — যা governance-এর দৃষ্টিতে একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্যের প্রশ্ন।
চুক্তি স্বাক্ষরের প্রায় তিন দশক পর: বাস্তবায়নের প্রকৃত চিত্র
একজন সুশাসন-বিশ্লেষকের দৃষ্টিতে সন্তু লারমার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মূল্যায়ন-বিন্দু হলো — ১৯৯৭ সালের চুক্তি কাগজে-কলমে যত বড় অর্জন হোক, বাস্তবে তার বাস্তবায়নের হার সীমিত থেকে গেছে। জাতিসংঘের আদিবাসী অধিকার বিষয়ক সাবেক বিশেষ র্যাপোর্টিয়ার ফ্রান্সিসকো কালি জাই (Francisco Cali Tzay) ২০২২ সালে চুক্তির ২৫ বছর পূর্তিতে এক বিবৃতিতে জানান, চুক্তি বাস্তবায়ন না হওয়া এই অঞ্চলের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি ও পরিচয়কে গুরুতরভাবে হুমকির মুখে ফেলেছে এবং তাদের মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে। এটি কেবল একটি রাজনৈতিক অভিযোগ নয়, বরং international human rights monitoring-এর আনুষ্ঠানিক পর্যবেক্ষণ।
২০২৫–২৬: নতুন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে পুরনো অসমাপ্ত এজেন্ডা
২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ঢাকায় সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (CPD), দ্য ডেইলি স্টার ও কয়েকটি ইউরোপীয় দূতাবাসের যৌথ উদ্যোগে অনুষ্ঠিত এক গোলটেবিল আলোচনায় আদিবাসী অধিকার বাস্তবায়নের অগ্রগতি ও চ্যালেঞ্জ নিয়ে আলোচনা হয় — যা প্রমাণ করে বিষয়টি এখনো নীতিনির্ধারণী মহলে জীবন্ত এজেন্ডা। আলোচনায় ভূমি কমিশনের অচলাবস্থা, পর্যটন-কেন্দ্রিক উচ্ছেদ এবং আঞ্চলিক পরিষদের ক্ষমতাহীনতা নিয়ে উদ্বেগ পুনর্ব্যক্ত হয়।
একইসঙ্গে, অন্তর্বর্তী সরকারের নীতি পূর্ববর্তী সরকারের নীতির থেকে খুব একটা ভিন্ন নয় বলে সমালোচনা এসেছে জেএসএস ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে। তাঁদের যুক্তি — ব্যক্তি বা দল বদলালেও পার্বত্য চট্টগ্রাম নীতিতে রাষ্ট্রের "security-first" দৃষ্টিভঙ্গি অপরিবর্তিত থেকেছে, যেখানে land governance ও cultural recognition গৌণ হয়ে থেকেছে।
জানুয়ারি ২০২৬-এ একটি প্রধান রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতার এক বক্তব্যে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর জন্য পৃথক কোটা-ব্যবস্থার বিরোধিতা এবং তাদের "আদিবাসী" হিসেবে না দেখে কেবল "বাংলাদেশি" হিসেবে দেখার অবস্থান প্রকাশ পাওয়ায় অধিকারকর্মীদের মধ্যে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এই বক্তব্যকে অনেকে সাংবিধানিক বিতর্কের পুনরুজ্জীবন হিসেবে দেখছেন — কারণ ২০১১ সালের পঞ্চদশ সংশোধনীতে "উপজাতি, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী" শব্দ ব্যবহার করা হলেও, "আদিবাসী" শব্দের আইনি স্বীকৃতি নিয়ে দীর্ঘদিনের টানাপোড়েন রয়েছে।
এই প্রবণতা — অর্থাৎ "আদিবাসী" পরিচয় ও তার সঙ্গে যুক্ত সাংবিধানিক/আইনি স্বীকৃতির প্রশ্নে রাজনৈতিক অবস্থানের রদবদল — চুক্তি-উত্তর প্রতিষ্ঠানগুলোর (আঞ্চলিক পরিষদ, জেলা পরিষদ) আইনি ভিত্তি ও ভবিষ্যৎ নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে। শান্তিচুক্তির বৈধতা আঞ্চলিক পরিষদ আইনের ওপর দাঁড়িয়ে, যা আবার "ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী"র সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য স্বীকার করে। পরিচয় অস্বীকারের রাজনীতি সেই আইনি ভিত্তিকেই দুর্বল করতে পারে। যেকোনো রাজনৈতিক রূপান্তরের সময় সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর অর্জিত অধিকার রক্ষা করা সুশাসনের একটি মৌলিক পরীক্ষা।
একটি সুশাসন-দৃষ্টিভঙ্গি থেকে মূল্যায়ন
এক ব্যক্তির রাজনৈতিক জীবনের ধারাবাহিকতা — শিক্ষক থেকে সশস্ত্র আন্দোলনের নেতা, তারপর আলোচক ও প্রাতিষ্ঠানিক নেতা — বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিরল। এই ধারাবাহিকতা ব্যক্তিগত resilience-এর প্রমাণ, কিন্তু একইসঙ্গে নেতৃত্বের কেন্দ্রীভবনের ঝুঁকিও তৈরি করেছে, যেখানে বিকল্প নেতৃত্ব গড়ে ওঠার সুযোগ সীমিত থেকেছে।
১৯৯৭ সালের চুক্তি সংঘাত থেকে সংলাপে উত্তরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত — যা আঞ্চলিকভাবে অনুকরণযোগ্য মডেল হতে পারত। এটি প্রমাণ করে যে দীর্ঘমেয়াদি low-intensity conflict-ও political settlement-এর মাধ্যমে শেষ করা সম্ভব, যদি উভয় পক্ষের commitment থাকে।
চুক্তি স্বাক্ষরের প্রায় তিন দশক পরেও এর মূল অঙ্গীকারগুলোর — ভূমি, নিরাপত্তা, রাজনৈতিক ক্ষমতা হস্তান্তর — বাস্তবায়ন অসম্পূর্ণ, যা রাষ্ট্রীয় প্রতিশ্রুতির বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্ন তোলে। Credibility gap তৈরি হলে ভবিষ্যৎ সংলাপ প্রক্রিয়াও দুর্বল হয়।
সন্তু লারমার নেতৃত্বের মূল্যায়ন তাই কেবল ব্যক্তিগত কৃতিত্ব বা ব্যর্থতার প্রশ্ন নয় — এটি রাষ্ট্র কীভাবে একটি স্বাক্ষরিত চুক্তির প্রতি দায়বদ্ধ থাকে, তারও একটি পরীক্ষা। তাঁর উত্তরাধিকার শেষ পর্যন্ত চুক্তি বাস্তবায়নের ইতিহাসের সঙ্গেই যুক্ত হয়ে থাকবে।
নীতিগত সুপারিশ (আলোচনার জন্য)
স্বাধীন বাস্তবায়ন পর্যালোচনা
চুক্তির প্রতিটি ধারার বাস্তবায়ন অবস্থা নিয়ে সরকার, জেএসএস ও স্বাধীন মানবাধিকার সংস্থার অংশগ্রহণে একটি সময়াবদ্ধ, স্বচ্ছ পর্যালোচনা প্রক্রিয়া চালু করা। Peace Accords Matrix-এর methodology অনুসরণ করে একটি public tracker প্রকাশ করা যেতে পারে, যাতে নাগরিকরা অগ্রগতি যাচাই করতে পারেন।
ভূমি কমিশনের কার্যকারিতা
ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনের বিচারিক ও প্রশাসনিক সক্ষমতা বাড়ানো — পূর্ণকালীন বিচারক, পর্যাপ্ত সার্ভেয়ার, ডিজিটাল রেকর্ড এবং অমীমাংসিত মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ। স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ ছাড়া কোনো নিষ্পত্তি গ্রহণযোগ্য হবে না।
প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতায়ন
আঞ্চলিক পরিষদ ও জেলা পরিষদে আইনে বর্ণিত ক্ষমতা প্রকৃত অর্থে হস্তান্তর করা, বিশেষত ভূমি প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত ক্ষেত্রে। Rule of law প্রতিষ্ঠার জন্য পরিষদের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিলের স্বচ্ছ বিধান এবং অর্থবছরভিত্তিক budget transparency প্রয়োজন।
রাজনৈতিক ধারাবাহিকতা রক্ষা
সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রাম নীতিতে যেন আকস্মিক বিপরীতমুখী পরিবর্তন না আসে, তার জন্য সংসদীয় বা প্রাতিষ্ঠানিক নিশ্চয়তা তৈরি করা। একটি standing parliamentary committee on CHT affairs এই ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে পারে।
অন্তর্ভুক্তিমূলক সংলাপ
জেএসএস, ইউপিডিএফ ও তাদের উপদলসহ পার্বত্য চট্টগ্রামের সব রাজনৈতিক অংশীজনকে নিয়ে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সংলাপ প্রক্রিয়া গড়ে তোলা, যাতে অভ্যন্তরীণ সংঘাতের চক্র থামানো যায়। Civil society, নারী নেতৃত্ব ও যুব প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণ ছাড়া টেকসই শান্তি সম্ভব নয়।
উপসংহার
জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমার জীবন একটি জনগোষ্ঠীর দীর্ঘ সংগ্রামের সঙ্গে এমনভাবে জড়িয়ে আছে যে তাঁকে নিয়ে নিরপেক্ষ আলোচনা মানে তাঁকে নিখুঁত বীর বা একচ্ছত্র খলনায়ক হিসেবে আঁকা নয় — বরং তাঁর নেতৃত্বাধীন প্রতিটি সিদ্ধান্তের ফলাফল, তার প্রেক্ষাপট এবং তার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব যাচাই করা। ১৯৯৭ সালের শান্তিচুক্তি তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন হিসেবে ইতিহাসে জায়গা পাবে, কিন্তু সেই চুক্তির অসম্পূর্ণ বাস্তবায়নই আজও প্রমাণ করে যে পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রকৃত শান্তি ও স্থিতিশীলতা এখনো একটি চলমান, অসমাপ্ত প্রকল্প।
এই বাস্তবতা মেনে নিয়েই তাঁর উত্তরাধিকার এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের ভবিষ্যৎ — উভয়কে একসঙ্গে বিচার করতে হবে। রাষ্ট্রের জন্য প্রশ্নটি হলো, একটি স্বাক্ষরিত চুক্তিকে কেবল ঐতিহাসিক দলিল হিসেবে সংরক্ষণ করা হবে, নাকি জীবন্ত আইনি ও নৈতিক অঙ্গীকার হিসেবে বাস্তবায়ন করা হবে। সন্তু লারমার জীবন সেই প্রশ্নেরই প্রতিচ্ছবি।
তথ্যসূত্র ও অধিকতর পাঠ
- The Daily Star — Santu Larma (সংবাদ সংকলন): thedailystar.net/tags/santu-larma
- The Daily Star — "Advancing Indigenous Rights in the Chittagong Hill Tracts" গোলটেবিল প্রতিবেদন, জানুয়ারি ২০২৬
- Prothom Alo English — "CHT Regional Council kept inactive, alleges Santu Larma," মে ২০২৪
- জাতিসংঘ মানবাধিকার হাইকমিশনারের কার্যালয় (OHCHR) — বিশেষ র্যাপোর্টিয়ারের বিবৃতি, ডিসেম্বর ২০২২ — Francisco Cali Tzay
- Peace Accords Matrix (Kroc Institute for International Peace Studies, University of Notre Dame) — CHT Peace Accord নথি ও বাস্তবায়ন ট্র্যাকার
- Wikipedia — Jyotirindra Bodhipriya Larma (জীবনী-সংক্রান্ত তথ্য যাচাইয়ের সহায়ক উৎস)
- CHT News (chtnews.com) — সন্তু লারমার নেতৃত্ব নিয়ে সমালোচনামূলক প্রতিবেদন, ২০২৫–২৬
- মূল জীবনী-রচনা: নিপ্পন চাকমা চিত্তি, "জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা স্যারের সংক্ষিপ্ত জীবনী" — ভাব ও তথ্যসূত্রের ভিত্তি

No comments:
Post a Comment
Please validate CAPTCHA