HR DEFENDER · মানবাধিকার · আন্তর্জাতিক আইন · প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি
নাজা: বেসামরিক মৃত্যুর রাষ্ট্রীয় যন্ত্র এবং বৈশ্বিক ন্যায়বিচারের সংকট
নজরদারি যখন পরিবারকে শনাক্ত করে, অ্যালগরিদম মানুষকে লক্ষ্যবস্তু হিসেবে তালিকাভুক্ত করে এবং প্রশাসনিক অনুমোদন হামলার পথ খুলে দেয়—তখন জবাবদিহির অনুসন্ধানকে পৌঁছাতে হয় সেই নীতি ও প্রতিষ্ঠানের কাছে, যেগুলো বেসামরিক ধ্বংসকে নিয়মিত কার্যপ্রণালিতে পরিণত করে।
১. অস্বীকারের দেয়ালে ফাটল: বিচ্ছিন্ন অপরাধ, নাকি ব্যবস্থার স্বাভাবিক ফল?
একটি শিশুর মৃত্যুর আগে কতগুলো দাপ্তরিক ধাপ সম্পন্ন হতে পারে? একটি তথ্যভান্ডার থেকে নাম নির্বাচন, ফোনের অবস্থান শনাক্ত, উপস্থিত মানুষের হিসাব, হামলার অনুমোদন—প্রতিটি ধাপ আলাদাভাবে নিয়মমাফিক মনে হতে পারে। অথচ এই ধাপগুলোর সম্মিলিত ফল হতে পারে একটি পরিবারের নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়া। নাজা সম্পর্কে প্রকাশিত অনুসন্ধান আমাদের সামনে এই ভয়াবহ সম্ভাবনাই তুলে ধরে: ব্যাপক বেসামরিক মৃত্যু কখনো প্রতিষ্ঠানের ব্যর্থতা নয়, বরং তার নির্ধারিত কার্যপ্রণালির ফলও হতে পারে।
গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইউভাল আব্রাহাম ও র্যাচেল জোর পরিচালিত তথ্যচিত্রটি ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হয়। এতে ইসরায়েলি সামরিক ও গোয়েন্দা কাঠামোর ২৪ জন অভ্যন্তরীণ ব্যক্তির সাক্ষ্য রয়েছে। গার্ডিয়ান-প্রযোজিত চলচ্চিত্রটির সহপ্রযোজক জেমস উইলসন এবং নির্বাহী প্রযোজক জনাথন গ্লেজার—যাঁরা The Zone of Interest-এর সঙ্গেও যুক্ত। সাক্ষাৎকারগুলো নেওয়া হয় তেল আবিবের বিভিন্ন ছাদে; পরিচয় সুরক্ষায় সাক্ষ্যদাতাদের চেহারা ও কণ্ঠ ডিজিটালভাবে পরিবর্তন করা হয়। গার্ডিয়ানের মূল অনুসন্ধান।
পরিচালকদের দৃষ্টিভঙ্গির গুরুত্ব এখানেই: তাঁরা শুধু কয়েকজন ব্যতিক্রমী সৈনিকের আচরণ নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন না; তাঁরা অনুসন্ধান করছেন আদেশ, নীতি, অনুমোদিত চর্চা এবং সেগুলোকে সম্ভব করে তোলা ভাষা ও যুক্তি। যখন একই ধরনের প্রাণহানি বারবার ঘটে, তখন শুধু হামলাকারীর আচরণ দেখলে অনুমোদনদাতা প্রতিষ্ঠানটি আড়ালেই থেকে যায়।
“ব্যবস্থাটি এবং তার চালিকাযন্ত্রের অংশগুলো।”
অভ্যন্তরীণ সাক্ষ্য রাষ্ট্রীয় অস্বীকারকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে। তবে ফিলিস্তিনি ভুক্তভোগীদের বক্তব্যের বিশ্বাসযোগ্যতা যেন অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানের সদস্যদের স্বীকৃতির ওপর নির্ভরশীল না হয়ে পড়ে। ফিলিস্তিনি সাংবাদিকতা, চিকিৎসা-নথি, প্রত্যক্ষদর্শীর বয়ান এবং ধ্বংসস্তূপের প্রমাণের সঙ্গে এসব সাক্ষ্য মিলিয়ে দেখতে হবে। প্রতিষ্ঠানের ভেতরের মানুষ সিদ্ধান্ত গ্রহণের নতুন তথ্য দিতে পারেন; তাঁরা নিহত মানুষের মানবিক মর্যাদা প্রদান করেন না। সেই মর্যাদা আগে থেকেই ছিল।
বাংলাদেশ থেকে প্রশ্নটি তাই শুধু একটি চলচ্চিত্রের রাজনৈতিক অভিঘাত নিয়ে নয়। প্রশ্ন হলো, আন্তর্জাতিক আইন কি ক্ষমতাবান রাষ্ট্রের ক্ষেত্রেও কার্যকর বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে? যে ব্যবস্থা নিহতদের জন্য শোক প্রকাশ করে, অথচ পরবর্তী মৃত্যুর উৎপাদন বন্ধ করতে পারে না, তার মানবিক ভাষা ও বাস্তব সক্ষমতার মধ্যে গভীর বিচ্ছেদ রয়েছে।
২. অ্যালগরিদমনির্ভর হত্যার প্রক্রিয়া: প্রযুক্তি কার সিদ্ধান্ত কার্যকর করছে?
গার্ডিয়ানে বর্ণিত সাক্ষ্যে উঠে এসেছে এআই-সহায়ক পদ্ধতিতে বিপুলসংখ্যক সন্দেহভাজন নিম্নস্তরের হামাস সদস্যকে শনাক্ত করার কথা। এরপর রাতে তাঁদের বাড়িতে হামলা করা হতো, যেখানে পরিবারের সদস্যদের নিহত হওয়ার বিষয়টি জানা ছিল বলে সাক্ষ্যদাতারা জানিয়েছেন। ফোন হ্যাক করে অবস্থান নির্ণয় এবং প্রাণঘাতী হামলার ঠিক আগে স্ত্রী-সন্তানের সঙ্গে কথোপকথন শোনার বিবরণও রয়েছে। এগুলো প্রতিবেদনে প্রকাশিত অভিযানের বিবরণ; প্রতিটি পৃথক হামলা সম্পর্কে স্বাধীনভাবে প্রতিষ্ঠিত বিচারিক সিদ্ধান্ত নয়। লক্ষ্যবস্তু নির্বাচন ও নজরদারির বিবরণ।
এখানে ‘অ্যালগরিদমনির্ভর হত্যা’ বলতে প্রযুক্তির মাধ্যমে বেআইনি হত্যাকাণ্ড সংগঠিত করার নৈতিক বিপদ বোঝানো হচ্ছে; কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণের বিকল্প হিসেবে শব্দটি ব্যবহার করা হচ্ছে না। প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তা লক্ষ্যবস্তু নির্বাচনের গতি ও পরিমাণ বাড়াতে পারে। একই সঙ্গে পর্দার তথ্যের পেছনে থাকা মানুষটির বাস্তব জীবন থেকে সিদ্ধান্তদাতাকে দূরে সরিয়ে দিতে পারে।
একটি সম্ভাব্যতার স্কোর কখনো প্রতিষ্ঠিত সত্যের কর্তৃত্ব পেয়ে যায়। একটি নামের পাশে যন্ত্রের দেওয়া চিহ্ন দেখে মানুষ ধরে নিতে পারে, যাচাই হয়ে গেছে। তখন মানবীয় অনুমোদনও পরিণত হতে পারে আনুষ্ঠানিক স্বাক্ষরে—যেখানে তথ্যের অনিশ্চয়তা, ভুল শনাক্তকরণ এবং পরিবারের উপস্থিতি নিয়ে যথেষ্ট প্রশ্ন তোলা হয় না।
কিন্তু অ্যালগরিদমের শ্রেণিবিন্যাস কাউকে বৈধ সামরিক লক্ষ্যবস্তু বানায় না। কোনো সংগঠনের সঙ্গে সন্দেহভাজন সম্পর্ক থাকলেই ব্যক্তি যুদ্ধরত বাহিনীর সদস্য, নাকি হামলা থেকে সুরক্ষিত বেসামরিক মানুষ—সে প্রশ্নের নিষ্পত্তি হয় না। বৈধ লক্ষ্যবস্তু উপস্থিত থাকলেও তাঁর আত্মীয় ও প্রতিবেশীদের পৃথক সুরক্ষা বিলুপ্ত হয় না। আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের মৌলিক শর্ত হলো বেসামরিক মানুষ ও সামরিক লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে পার্থক্য করা। আইসিআরসির প্রথাগত আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের বিধান।
লক্ষ্যবস্তু বৈধ হলেও প্রত্যাশিত আনুষঙ্গিক বেসামরিক ক্ষতি যদি প্রত্যাশিত সুনির্দিষ্ট ও প্রত্যক্ষ সামরিক সুবিধার তুলনায় অতিরিক্ত হয়, সেই হামলা নিষিদ্ধ। এই মূল্যায়ন নির্দিষ্ট হামলার বাস্তব পরিস্থিতি নিয়ে; পুরো যুদ্ধকে প্রয়োজনীয় ঘোষণা করে প্রতিটি হামলার বৈধতা প্রতিষ্ঠা করা যায় না। আগে থেকে নির্ধারিত একটি প্রাণহানির সীমাও নিজে নিজে আইন মেনে চলার প্রমাণ নয়। আবার বেসামরিক মানুষের মৃত্যুর সম্ভাবনা জানা ছিল বলেই প্রতিটি হামলা স্বয়ংক্রিয়ভাবে অপরাধ প্রমাণিত হয় না—প্রত্যাশিত ক্ষতি, সামরিক সুবিধা, উপলব্ধ তথ্য এবং প্রযোজ্য অপরাধের মানসিক উপাদান পরীক্ষা করতে হয়। আইসিআরসি বিধি ১৪: হামলায় সমানুপাতিকতা।
রাতে পরিবারের উপস্থিতিতে বাড়িতে হামলার অভিযোগ বিশেষ অনুসন্ধান দাবি করে। অন্য সময়, অন্য অস্ত্র বা হামলা বাতিলের সুযোগ বিবেচিত হয়েছিল কি? শিশুর উপস্থিতি জানা গেলে সিদ্ধান্ত বদলানোর ক্ষমতা কার ছিল? অভিযান সহজ হওয়া আর বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত হওয়া এক বিষয় নয়। আইন বেসামরিক ক্ষতি এড়াতে বা কমাতে বাস্তবসম্মত সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি করে। আইসিআরসি বিধি ১৫: হামলায় সতর্কতা।
পারিবারিক কথোপকথনে আড়িপাতার বিবরণ জ্ঞাতসারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রশ্নটিকে আরও তীক্ষ্ণ করে। নথি যদি দেখায়, হামলার আগে শিশুর কণ্ঠ শোনা হয়েছিল, তবে সেটি অনুমোদনের মুহূর্তে কী জানা ছিল তা প্রমাণে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। এমন তথ্য প্রতিটি আইনি প্রশ্নের উত্তর নয়; কিন্তু বেসামরিক উপস্থিতি অপ্রত্যাশিত ছিল—এমন সাধারণ ব্যাখ্যাকে দুর্বল করতে পারে।
প্রতিবেদনে বর্ণিত চর্চা থেকে যে কাঠামোগত আশঙ্কা তৈরি হয়, তা হলো বেসামরিক হত্যাকে বৃহৎ পরিসরে পুনরাবৃত্তিযোগ্য প্রক্রিয়ায় পরিণত করা। প্রযুক্তি নিজে নৈতিক উদ্দেশ্য নির্ধারণ করে না। অনুসন্ধানের কেন্দ্র হতে হবে: প্রতিষ্ঠান তার মানুষ ও যন্ত্রকে কী অর্জনের নির্দেশ দিয়েছিল, এবং সেই অর্জনের বিনিময়ে কোন পরিণতি জেনেশুনে গ্রহণ করেছিল?
৩. প্রাতিষ্ঠানিক সম্পৃক্ততা ও নির্বাহী দায়: অনুসন্ধান কতটা ওপরে যাবে?
প্রতিবেদন অনুযায়ী, কয়েকজন সাক্ষ্যদাতা এমন একটি গোপন গোয়েন্দা ইউনিটে কাজ করেছেন, যেটি সরাসরি বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কার্যালয়ে প্রতিবেদন দিত। একজন তার কাজকে ‘শান্তি বিঘ্নিত করা’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এটি গুরুতর সাক্ষ্য, কিন্তু একজনের বর্ণনাকে যাচাইকৃত লিখিত নির্দেশনা হিসেবে উপস্থাপন করা যাবে না। একইভাবে এটি থেকে প্রধানমন্ত্রী ব্যক্তিগতভাবে প্রতিটি অভিযোগকৃত হত্যার নির্দেশ দিয়েছেন—এমন সিদ্ধান্তও টানা যায় না। নির্বাহী কার্যালয়ের সঙ্গে সংযোগের বিবরণ।
এই তথ্যের গুরুত্ব নতুন অনুসন্ধানের দরজা খোলায়। ইউনিটটির আনুষ্ঠানিক দায়িত্ব কী ছিল? অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতেন কে? কোন তথ্য নির্বাহী কার্যালয়ে পৌঁছাত? কার্যক্রমের উদ্দেশ্য বৈধ নিরাপত্তা প্রয়োজন ছিল, নাকি কূটনৈতিক বিকল্প ও স্বাধীন পর্যবেক্ষণকে বাধাগ্রস্ত করা? উত্তর পেতে প্রয়োজন সত্যতা-যাচাইকৃত যোগাযোগ, দায়িত্ব অর্পণের আদেশ, বাজেট, সাংগঠনিক কাঠামো এবং সমসাময়িক নথির সঙ্গে মিলিয়ে দেখা সাক্ষ্য।
কাঠামোগত বিশ্লেষণ দায়কে অস্পষ্ট করার জন্য নয়; বরং আরও নির্দিষ্ট করার জন্য। কেউ লক্ষ্য নির্ধারণ করতে পারেন, কেউ তথ্যের শ্রেণিবিন্যাস তৈরি করতে পারেন, কেউ সম্ভাব্য প্রাণহানি অনুমোদন করতে পারেন, আবার কেউ অভিযানের চূড়ান্ত নির্দেশ দিতে পারেন। এসব ভূমিকার নৈতিক ও আইনি অবস্থান এক নয়। তদন্তকে নির্ধারণ করতে হবে কে কী করেছেন, কী জানতেন, কী উদ্দেশ্য ছিল এবং কী ঠেকানোর সুযোগ থাকা সত্ত্বেও ঠেকাননি।
রোম সংবিধিতে ব্যক্তিগত অংশগ্রহণের বিভিন্ন ধরন এবং কমান্ডার বা ঊর্ধ্বতনের দায় পৃথকভাবে বিবেচিত হয়। অনুচ্ছেদ ২৮ কার্যকর নিয়ন্ত্রণ বা কর্তৃত্ব, নির্ধারিত জ্ঞানের মানদণ্ড এবং প্রয়োজনীয় ও যুক্তিসংগত ব্যবস্থা গ্রহণে ব্যর্থতার সঙ্গে সম্পর্কিত। সামরিক ও বেসামরিক ঊর্ধ্বতনের ক্ষেত্রে মানদণ্ডও পুরোপুরি অভিন্ন নয়। শুধু পদমর্যাদার নৈকট্য অপরাধ প্রমাণ করে না; আবার দায়িত্ব অধস্তনের হাতে দিলেই আইনগত দায় শেষ হয়ে যায় না। রোম সংবিধি, অনুচ্ছেদ ২৫ ও ২৮।
প্রযুক্তিনির্ভর দায়মুক্তি বিস্তৃত হয় যখন প্রত্যেকে নিজের কাজের একটি খণ্ডের মালিকানা স্বীকার করেন, অথচ সামগ্রিক পরিণতির দায় কেউ নেন না। তদন্ত শুধু অস্ত্র প্রয়োগকারী ব্যক্তিতে সীমাবদ্ধ থাকলে যে সিদ্ধান্ত গোটা শ্রেণির হামলাকে নিয়মিত করেছে, তা বাদ পড়ে যেতে পারে। আবার প্রতিটি প্রকৌশলী বা সৈনিককে নির্বিচারে অভিযুক্ত করাও একইভাবে ভুল। প্রমাণের পথ অনুসরণ করেই দায় নির্ধারণ করতে হবে—প্রয়োজনে নির্বাহী নেতৃত্ব পর্যন্ত।
চলচ্চিত্রে ডিজিটাল পরিচয়-সুরক্ষা প্রয়োজনীয় হতে পারে; আদালতে অতিরিক্ত যাচাই দরকার। নিরাপদ পদ্ধতিতে পরিচয় নিশ্চিত করা, প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা ও শোনা কথার পার্থক্য নির্ধারণ, বক্তব্যের সামঞ্জস্য পরীক্ষা এবং স্বাধীন প্রমাণ সংগ্রহ অপরিহার্য। সাক্ষীর সুরক্ষা ও অভিযুক্তের ন্যায়সংগত বিচারের অধিকার পরস্পরের প্রতিপক্ষ নয়; উভয়ই টেকসই জবাবদিহির ভিত্তি।
৪. ‘নাজা’ এবং আমলাতান্ত্রিক ভাষা: মানুষ যখন অনুমোদনযোগ্য সংখ্যায় পরিণত হয়
গার্ডিয়ান ‘নাজা’কে এমন একটি সামরিক সংক্ষিপ্ত রূপ হিসেবে বর্ণনা করেছে, যা হামলায় প্রত্যাশিত বেসামরিক মৃত্যুকে আড়ালকারী ভাষায় নির্দেশ করে। প্রতিবেদনে এর পূর্ণ ভাষাগত সম্প্রসারণ দেওয়া হয়নি; তাই সেটি অনুমান করে লেখা সমীচীন নয়। একই অনুসন্ধানে এমন এলাকায় ধ্বংসযজ্ঞের সাক্ষ্য রয়েছে, যেখানে সামরিক হিসাবেই সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ বাসিন্দা তখনও অবস্থান করছিলেন। বেসামরিক বাড়িঘর পরিকল্পিতভাবে পোড়ানো এবং একটি খাদ্য বিতরণস্থলে বেসামরিক মানুষ হত্যার বিবরণও রয়েছে। শেষের অভিযোগকে সব খাদ্য বিতরণকেন্দ্রে হামলার প্রমাণিত নীতি হিসেবে বাড়িয়ে বলা যাবে না। নামকরণ ও ধ্বংসযজ্ঞের সাক্ষ্য।
একটি সংক্ষিপ্ত রূপ অনুমোদনপত্রে একটি পরিবারকে কয়েকটি অক্ষরে নামিয়ে আনতে পারে। নাম, বয়স, প্রতিবন্ধিতা, যত্নের প্রয়োজন এবং পালানোর অক্ষমতা হারিয়ে যায়; থেকে যায় একটি সংখ্যা। সংখ্যা অনুমোদিত হয়ে গেলে সেটি কখনো সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার কারণ হওয়ার পরিবর্তে নিয়ম অনুসরণের প্রমাণ হয়ে দাঁড়ায়।
বেসামরিক ক্ষতির আগাম হিসাব করা অবশ্যই প্রয়োজন। সমস্যা হিসাব করার মধ্যে নয়; সমস্যা তখন, যখন হিসাব বাস্তব সংযম আরোপ না করে প্রাণহানির অনুমতিপত্রে পরিণত হয়। অনুমানটি কি হামলা থামিয়েছে, পরিবর্তন করেছে, নাকি আগে নেওয়া সিদ্ধান্তের পাশে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত হয়েছে? দ্বিতীয়টি ঘটলে প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সতর্কতার ছাপ তৈরি করার পাশাপাশি জ্ঞাতসারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রমাণও রেখে যেতে পারে।
কত মানুষ থেকে গেছেন, সেই হিসাব তাই গুরুত্বপূর্ণ। এলাকা ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হলেই যাঁরা যেতে পারেননি বা যাননি, তাঁরা আইনের সুরক্ষা থেকে মুছে যান না। একটি ভূখণ্ডকে অভিযানের এলাকা ঘোষণা করেও তার প্রতিটি বস্তু সামরিক লক্ষ্যবস্তু বানানো যায় না। বাড়ি পোড়ানোর অভিযোগের ক্ষেত্রে সামরিক প্রয়োজন, সম্পত্তি ধ্বংস, বাস্তুচ্যুতি এবং মানুষের ফিরে আসা ইচ্ছাকৃতভাবে অসম্ভব করা হয়েছিল কি না—এসব প্রশ্ন তদন্ত করতে হবে।
খাদ্যের ক্ষেত্রে প্রশ্ন আরও মৌলিক: মানুষের বেঁচে থাকার প্রয়োজনকেই কি নিয়ন্ত্রণ ও বাধ্য করার উপকরণে পরিণত করা হয়েছে? আইপিসি ২০২৫ সালের আগস্টে জানিয়েছিল, ১৫ আগস্ট থেকে গাজা গভর্নরেটে যুক্তিসংগত প্রমাণের ভিত্তিতে দুর্ভিক্ষ নিশ্চিত হয়েছে। এই মূল্যায়ন নির্দিষ্ট সময় ও এলাকার; আজ পুরো গাজা একই শ্রেণিবিন্যাসে রয়েছে—এমন দাবি নয়। সংশ্লিষ্ট জাতিসংঘ সংস্থাগুলোর বিবৃতিতে দুর্ভিক্ষকে মানবসৃষ্ট বলা হয়েছিল। আইপিসির মূল্যায়ন; জাতিসংঘ সংস্থাগুলোর যৌথ বিবৃতি।
গার্ডিয়ানের ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর প্রতিবেদনে ৭৩ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত এবং ১ লাখ ৭৪ হাজারের বেশি আহত হওয়ার তথ্য দেওয়া হয়েছে; সম্মিলিত সংখ্যার মাত্রাকে গাজার যুদ্ধপূর্ব জনসংখ্যার এক-দশমাংশের বেশি বলা হয়েছে। এগুলো তারিখযুক্ত প্রকাশিত হিসাব, এই নিবন্ধের স্বাধীন নিরীক্ষার ফল নয়। আহত হওয়ার পর মৃত্যুবরণ করা ব্যক্তি দুই হিসাবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন কি না, তা পরীক্ষা ছাড়া যোগফলকে স্বতন্ত্র ব্যক্তির নিশ্চিত সংখ্যা বলা যাবে না। প্রাণহানির তারিখযুক্ত প্রতিবেদন।
একটি বাড়ি ধ্বংস হলে শুধু দেয়াল পড়ে না। আশ্রয়, পারিবারিক পরিচর্যা, জীবনের ধারাবাহিকতা এবং পুনরুদ্ধারের ভিত্তিও ভেঙে যায়। শুধু তাৎক্ষণিক মৃত্যু গুনে বেঁচে থাকার পরিবেশের পতন উপেক্ষা করলে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের প্রকৃত মানবিক পরিণতি আড়ালে থেকে যায়।
৫. বৈশ্বিক ন্যায়বিচারের সংকট: শোকের ভাষা থেকে কার্যকর নীতিতে
গ্লোবাল সাউথের মানবাধিকার অবস্থানকে সর্বজনীন সুরক্ষা ধারাবাহিকভাবে সমর্থন করতে হবে। ৭ অক্টোবর ২০২৩-এর হামাস-নেতৃত্বাধীন হামলায় বেসামরিক মানুষ হত্যা ও জিম্মি করার অপরাধের জবাবদিহি প্রয়োজন। সেই অপরাধ পরবর্তী সময়ে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে অপরাধের অনুমতি দেয় না। একইভাবে ইসরায়েলি রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডের সমালোচনাকে ইহুদি বা ইসরায়েলি জনগণের বিরুদ্ধে সমষ্টিগত দোষারোপে পরিণত করা যাবে না। দায় নির্ধারিত হবে কাজ ও আইনগতভাবে প্রতিষ্ঠিত অংশগ্রহণের ভিত্তিতে।
জাতিসংঘের স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশন ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিল যে ইসরায়েল গাজায় গণহত্যা সংঘটিত করেছে। এটি জাতিসংঘের ম্যান্ডেটপ্রাপ্ত স্বাধীন অনুসন্ধানী সংস্থার সিদ্ধান্ত; কোনো আন্তর্জাতিক আদালতের চূড়ান্ত রায় নয়, কিংবা জাতিসংঘের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের অভিন্ন ঘোষণা নয়। ইসরায়েল গণহত্যার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে। কমিশনের সিদ্ধান্ত; ইসরায়েলের প্রতিক্রিয়াসহ প্রতিবেদন।
আইনি প্রতিষ্ঠানগুলোর কাজও পৃথক। আন্তর্জাতিক বিচার আদালত বা আইসিজে রাষ্ট্রের দায় নিয়ে কাজ করে। দক্ষিণ আফ্রিকা বনাম ইসরায়েল মামলার অন্তর্বর্তী ব্যবস্থাগুলো বাধ্যতামূলক সুরক্ষামূলক আদেশ; সেগুলো গণহত্যা সংঘটিত হওয়ার চূড়ান্ত রায় নয়। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত বা আইসিসি ব্যক্তির অপরাধমূলক দায় বিচার করে। নেতানিয়াহু ও ইয়োভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের নভেম্বরে জারি করা পরোয়ানাগুলো অনাহারকে যুদ্ধপদ্ধতি হিসেবে ব্যবহারের অভিযোগসহ যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধ নিয়ে; গ্রেপ্তারি পরোয়ানা দোষী সাব্যস্ত হওয়ার সমার্থক নয়। আইসিজের অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা; আইসিসির পরোয়ানা-সংক্রান্ত ঘোষণা।
গণহত্যা প্রতিষ্ঠার জন্য সুরক্ষিত কোনো জনগোষ্ঠীকে সম্পূর্ণ বা আংশিক ধ্বংস করার নির্দিষ্ট অভিপ্রায় প্রমাণ প্রয়োজন। একটি সফটওয়্যার বা প্রাণহানির সংখ্যা একাই সেই অভিপ্রায় প্রতিষ্ঠা করে না। এই নির্ভুলতা ন্যায়বিচারের দাবি দুর্বল করে না; বরং অভিযোগকে প্রমাণযোগ্য আইনি ভিত্তিতে দাঁড় করায়। রোম সংবিধি, অনুচ্ছেদ ৬।
তবে চূড়ান্ত ফৌজদারি রায়ের জন্য অপেক্ষা করে বিপজ্জনক সহায়তা চলতে দেওয়া প্রতিরোধের উদ্দেশ্যকেই ব্যর্থ করে। শাস্তি দেওয়ার প্রমাণের মানদণ্ড এবং সম্ভাব্য নৃশংসতা ঠেকাতে সতর্কতামূলক পদক্ষেপের উদ্দেশ্য এক নয়। এই উপলব্ধি থেকে পাঁচটি নীতিগত অগ্রাধিকার জরুরি।
অস্ত্র ও কার্যকর সামরিক সহায়তার প্রবাহ বন্ধ করা
ইসরায়েলের ওপর অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা আরোপ এবং বেআইনি হামলায় সহায়তার গুরুতর ঝুঁকি বহনকারী অস্ত্র, যন্ত্রাংশ ও অভিযান-সহায়তা অবিলম্বে স্থগিত করা উচিত। অনুমোদনের যুক্তি প্রকাশ এবং মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে সরবরাহ ঠেকানোর ব্যবস্থাও প্রয়োজন। অস্ত্র বাণিজ্য চুক্তির অনুচ্ছেদ ৬ নিষিদ্ধ হস্তান্তর এবং অনুচ্ছেদ ৭ রপ্তানির ঝুঁকি মূল্যায়নের দায়িত্ব নির্ধারণ করে এর পক্ষভুক্ত রাষ্ট্রগুলোর জন্য। চুক্তিটি নিজে থেকেই সব রাষ্ট্রকে আবদ্ধ করে না। এখানে পূর্ণাঙ্গ নিষেধাজ্ঞা একটি নীতিগত দাবি; পাশাপাশি প্রতিটি রাষ্ট্রের প্রযোজ্য আইনি দায়িত্ব পালন অপরিহার্য। অস্ত্র বাণিজ্য চুক্তি বিষয়ে জাতিসংঘের আইনি বিবরণ।
সিদ্ধান্ত ও ক্ষয়ক্ষতির সংযোগকারী প্রমাণ সংরক্ষণ করা
স্বাধীন তদন্তকারীদের লক্ষ্যতালিকা, ব্যবহৃত মডেলের সংস্করণ, তথ্যের উৎস, অনিশ্চয়তার মূল্যায়ন, যোগাযোগ, অনুমোদনের নথি, সম্ভাব্য প্রাণহানির হিসাব এবং হামলা-পরবর্তী পর্যালোচনা আইনসংগতভাবে সংরক্ষণের উদ্যোগ নিতে হবে। প্রাসঙ্গিক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নথিও এর অন্তর্ভুক্ত হওয়া উচিত। ব্যক্তিগত তথ্য ও গোপন সূত্রের সুরক্ষা বজায় রেখে জানতে হবে: কে কখন কী জানতেন, কোন সতর্কতা পেয়েছিলেন এবং তার পরও কী সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন?
আন্তর্জাতিক ও দেশীয় বিচারব্যবস্থাকে একসঙ্গে কার্যকর করা
রাষ্ট্রগুলোকে নিজ নিজ বাধ্যবাধকতা অনুযায়ী আইসিসিকে সহযোগিতা, আইসিজের আদেশ বাস্তবায়নে সমর্থন এবং স্বাধীন জাতিসংঘ তদন্তে অর্থায়ন করতে হবে। দেশীয় কৌঁসুলিরা প্রযোজ্য সর্বজনীন এখতিয়ার আইনের আওতায় বিশ্বাসযোগ্য অভিযোগ মূল্যায়ন করতে পারেন। তবে প্রত্যেক আদালতের এই ক্ষমতা স্বয়ংক্রিয় নয়; জাতীয় আইন, প্রমাণ, প্রযোজ্য উপস্থিতির শর্ত এবং দায়মুক্তির প্রশ্ন বিবেচনা করতে হবে। আইসিআরসি বিধি ১৫৭: যুদ্ধাপরাধের বিচারিক এখতিয়ার।
মানবীয় নিয়ন্ত্রণকে হামলা থামানোর বাস্তব ক্ষমতা দেওয়া
বৈধ লক্ষ্যবস্তু পৃথক করা এবং পরিস্থিতিনির্ভর মূল্যায়নকে সমর্থন করতে অক্ষম ব্যবস্থার ওপর অভিযান পরিচালনার নির্ভরতা নিষিদ্ধ করা উচিত। স্বাধীন পরীক্ষা, সিদ্ধান্তের অনুসরণযোগ্য যুক্তি, অনিশ্চয়তার প্রকাশ, আপত্তি জানানোর সুরক্ষিত ব্যবস্থা এবং হামলা বাতিলের কার্যকর ক্ষমতা থাকতে হবে। বেআইনি ক্ষতি মেনে নেওয়ার জন্য তৈরি নীতিকে একজন মানুষের স্বাক্ষর বৈধ করতে পারে না। নজরদারি প্রতিষ্ঠানকে প্রয়োগ বন্ধ ও অসদাচরণের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা দিতে হবে।
ফিলিস্তিনি মানুষের জীবন ও সিদ্ধান্তের অধিকারকে কেন্দ্রে রাখা
অবিচ্ছিন্ন মানবিক প্রবেশাধিকার, বেসামরিক সুরক্ষা, খাদ্য বিতরণে স্বাধীন পর্যবেক্ষণ এবং ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠীর নেতৃত্বে পুনর্গঠন নিশ্চিত করতে হবে। চিকিৎসার জন্য নিরাপদ স্থানান্তর, পুনর্বাসন, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, নিখোঁজ স্বজনের সন্ধান এবং ভুক্তভোগীদের নেতৃত্বে তথ্য সংরক্ষণকে সহায়তা দিতে হবে। বাংলাদেশ বহুপক্ষীয় কূটনীতিতে এসব দাবি তুলতে পারে; একই সঙ্গে নিজ দেশেও বেসামরিক সুরক্ষা ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহির মানদণ্ড শক্তিশালী করতে হবে। দেশের ভেতরে যে নীতি রক্ষা করা হয়, বিদেশে তার পক্ষে অবস্থান অধিক বিশ্বাসযোগ্য হয়।
বৈশ্বিক সংকট আইনি শব্দের অভাবের সংকট নয়। সংকট হলো, কৌশলগত সম্পর্কের ভিত্তিতে সেই শব্দের বাস্তব পরিণতি নির্ধারণ করা। কার্যকর আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা শুধু হামলার শেষ মুহূর্তকে দেখবে না; অস্ত্র সরবরাহ, গোয়েন্দা কাঠামো, নির্বাহী নির্দেশনা এবং বাণিজ্যিক সহায়তার ভূমিকাও পরীক্ষা করবে।
নাজা সম্পর্কে প্রকাশিত অনুসন্ধান আমাদের সামনে এই সম্ভাবনা হাজির করে যে পূর্বানুমেয় বেসামরিক ধ্বংস অভিযানের নকশাতেই অন্তর্ভুক্ত ছিল। তার উত্তর হতে হবে এমন স্বাধীন তদন্ত, যা সেই নকশা ও তার প্রণেতাদের কাছে পৌঁছাতে পারে। একটি সংক্ষিপ্ত রূপের বদলে কোমল শব্দ বসিয়ে ফিলিস্তিনি জীবন ফিরিয়ে আনা যাবে না। জীবন রক্ষার জন্য প্রয়োজন ধ্বংসের প্রক্রিয়া থামানো; ন্যায়বিচারের জন্য প্রয়োজন প্রমাণ করা—সেই প্রক্রিয়া কারা তৈরি করেছেন, পরিচালনা করেছেন এবং ব্যবহার করেছেন।

No comments:
Post a Comment
Please validate CAPTCHA