“শাসনের পতন না হওয়া পর্যন্ত হামলা চালিয়ে যাওয়া ছাড়া উপায় নেই”: প্রাক্তন মোসাদ প্রধান বার্নিয়ার বক্তব্য ও বিশ্ব শান্তির ভবিষ্যৎ
সূচিপত্র
- নির্বাহী সারসংক্ষেপ
- তথ্যের ভিত্তি: কী ঘটেছে?
- বার্নিয়া মতবাদ: জোরপূর্বক শাসন পরিবর্তনের বিপদ
- হরমুজ প্রণালী ও কূটনীতির মৃত্যু
- বৈরুতে মার্কিন-হিজবুল্লাহ যোগাযোগ: বাস্তবতা বনাম নীতি
- গাজায় যুদ্ধবিরতির মধ্যেও হত্যা
- ছায়া কূটনীতি: রোনেন বার ও শ্লোমি ফোগেল
- অর্থনৈতিক যুদ্ধ: চীনা ব্যাংকের উপর নিষেধাজ্ঞার হুমকি
- পশ্চিম তীরে ৩৫,০০০ মানুষের বাস্তুচ্যুতি
- আন্তর্জাতিক আইনের আলোকে বিশ্লেষণ
- মানবিক ও মানব নিরাপত্তার প্রভাব
- টেকসই শান্তির পথ: ১২ দফা নীতি সুপারিশ
- উপসংহার: আলো আসবে বোমা থেকে নয়, আইন থেকে
নির্বাহী সারসংক্ষেপ
প্রাক্তন মোসাদ প্রধান ডেভিড বার্নিয়া ২০২৬ সালের জুনে জেরুজালেম পৌরসভা আয়োজিত এক সংবর্ধনায় বলেন, “এই শাসনের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক, কূটনৈতিক ও অপারেশনাল কর্মকাণ্ড তীব্র করা ছাড়া কোনো উপায় থাকবে না — যতক্ষণ না এটি পড়ে যায় — এবং এটি পড়ে যাবেই।”
এই একটি বাক্য কোনো বিচ্ছিন্ন মন্তব্য নয়। এটি একটি মতবাদের প্রকাশ — যেখানে একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের সরকারকে বলপ্রয়োগে উৎখাত করাকে বৈধ ও অনিবার্য হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। আমার এই অনুসন্ধানে আমি দেখিয়েছি, একই দিনে প্রকাশিত আরও আটটি ঘটনা এই মতবাদের বিপজ্জনক পরিণতি প্রমাণ করে:
- জুন মাসের হরমুজ প্রণালী সংক্রান্ত সমঝোতা স্মারক (MOU) ভেঙে পড়া এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ঘোষণা — “আমরা ইরানের সাথে কথা বলতে চাই না”।
- লেবাননে মার্কিন রাষ্ট্রদূত মিশেল ইসাকে হিজবুল্লাহর সাথে সরাসরি আলোচনার সবুজ সংকেত দেওয়া।
- গাজায় যুদ্ধবিরতির মধ্যেই দুই হামাস কমান্ডারকে হত্যা, IDF-এর ভাষায় “হুমকি অপসারণ”।
- পশ্চিম তীরের তিনটি শরণার্থী শিবির থেকে ৩৫,০০০ ফিলিস্তিনিকে ফিরতে না দেওয়ার সরকারি সিদ্ধান্ত।
- চীনা ব্যাংকগুলোর উপর সেকেন্ডারি স্যাংশনের হুমকি।
আমার মূল্যায়ন হলো — শান্তি আসে না শাসন ফেলে দেওয়ার হুমকি থেকে। শান্তি আসে আইন, জবাবদিহিতা এবং মানুষের মর্যাদা রক্ষা থেকে। ইরানি জনগণ, যারা সত্যিই আলোর জন্য আকুল, তাদের মুক্তি বোমার নিচে নয়, ন্যায়বিচারের মধ্যেই নিহিত।
১. তথ্যের ভিত্তি: কী ঘটেছে?
দ্য টাইমস অফ ইসরায়েলের ২৮ আগস্ট ২০২৬-এর লাইভ ব্লগ অনুযায়ী:
ক) কাতারের প্রধানমন্ত্রী তেহরান সফর করেছেন, যখন হোয়াইট হাউস বলছে তারা ইরানের সাথে কোনো আলোচনা করছে না।
খ) লেবাননের MTV নেটওয়ার্ক জানায়, ট্রাম্প প্রশাসন বৈরুতে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূতকে হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্রীকরণের লক্ষ্যে আলোচনার অনুমতি দিয়েছে।
গ) একজন মধ্যস্থতাকারী দেশের জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক জানান, জুন মাসের MOU ভেঙে গেছে হরমুজ প্রণালী পুনরায় খোলার শর্ত নিয়ে ভিন্ন ব্যাখ্যার কারণে। ট্রাম্প এখন মনে করেন ইরান তাকে “বারবার শেষ মুহূর্তে পুড়িয়েছে”।
ঘ) ইরানের নিরাপত্তা প্রধান মোহসেন রেজায়ি আল-মানার টিভিতে ট্রাম্পের কনিষ্ঠ পুত্র ব্যারন ট্রাম্পকে হত্যার ষড়যন্ত্রের খবরকে “মিথ্যা” বলে উড়িয়ে দিয়েছেন।
ঙ) IDF জানায়, গাজা সিটির শাতি শিবির ও খান ইউনিসে দুই হামাস কমান্ডারকে হত্যা করা হয়েছে, যদিও যুদ্ধবিরতি চলমান।
চ) সাবেক শিন বেত প্রধান রোনেন বার অক্টোবর ৭-এর পর থেকে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনে সরাসরি হামাসের সাথে জিম্মি মুক্তি নিয়ে আলোচনা করেছেন — যা সেন্সর এতদিন আটকে রেখেছিল।
ছ) একই দিনে চ্যানেল ১২ প্রকাশ করে, ২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রীর সহযোগী ব্যবসায়ী শ্লোমি ফোগেল গাজায় হামাস নেতা গাজি হামাদের সাথে গোপনে যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনা করছিলেন, যখন তিনজন জেনারেল ও শিন বেত প্রধান কায়রোতে আনুষ্ঠানিক আলোচনা করছিলেন। নিরাপত্তা কর্মকর্তারা দুবার নেতানিয়াহুকে জিজ্ঞেস করলে তিনি দুবারই “জানি না” বলেন।
জ) সরকার হাইকোর্টকে জানিয়েছে, তারা জেনিন, তুলকারেম ও নুর আল-শামস শিবিরের ৩৫,০০০ বাসিন্দাকে ফিরতে দেবে না।
২. বার্নিয়া মতবাদ: জোরপূর্বক শাসন পরিবর্তনের বিপদ
“আমার মূল্যায়নে, এই শাসনের পতন না হওয়া পর্যন্ত অর্থনৈতিক, কূটনৈতিক ও অপারেশনাল পদক্ষেপ তীব্র করা ছাড়া কোনো উপায় থাকবে না — এবং এটি পড়ে যাবেই।” — ডেভিড বার্নিয়া, প্রাক্তন মোসাদ প্রধান
একজন প্রাক্তন গোয়েন্দা প্রধানের এই প্রকাশ্য আহ্বান তিনটি কারণে বিপজ্জনক:
প্রথমত, এটি আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন।
জাতিসংঘ সনদের ২(৪) অনুচ্ছেদ স্পষ্টভাবে বলপ্রয়োগের হুমকি বা প্রয়োগ নিষিদ্ধ করে। আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (ICJ) নিকারাগুয়া মামলায় বলেছে, অন্য রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ব্যবস্থা পরিবর্তনের জন্য বলপ্রয়োগ অবৈধ হস্তক্ষেপ। “শাসনের পতন”কে লক্ষ্য বানানো মানে ইরানি জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারকে অস্বীকার করা।
দ্বিতীয়ত, এটি ইরানি জনগণকে উপকরণে পরিণত করে।
বার্নিয়া বলেন, “ইরানের জনগণ এর পতনের জন্য আকুল।” একজন মানবাধিকার রক্ষাকর্মী হিসেবে আমি বলি — হ্যাঁ, ইরানি জনগণ মর্যাদা, মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার চায়। কিন্তু তাদের আকাঙ্ক্ষাকে বাইরের বোমা হামলার বৈধতা হিসেবে ব্যবহার করা তাদের প্রতি অবমাননা। নিপীড়িত জনগণকে রক্ষা করতে হয়, তাদের উপর যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়ে নয়।
তৃতীয়ত, এটি চিরস্থায়ী যুদ্ধের যুক্তি তৈরি করে।
যখন লক্ষ্য হয় “শাসনের পতন”, তখন যুদ্ধের কোনো শেষ বিন্দু থাকে না, কোনো আনুপাতিকতা থাকে না। প্রতিটি হামলাই বৈধ হয়ে যায়। এটিই বিশ্ব শান্তির জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি।
৩. হরমুজ প্রণালী ও কূটনীতির মৃত্যু
মধ্যস্থতাকারী কূটনীতিকের ভাষ্য অনুযায়ী, জুন মাসের MOU ভেঙেছে হরমুজ প্রণালীর অস্পষ্ট শর্তের কারণে। ট্রাম্প প্রশাসন এখন আলোচনা নয়, “অর্থনৈতিক চাপে ইরানকে নতজানু করার” নীতি নিয়েছে।
⚖️ আইনি কাঠামো: UNCLOS
সমুদ্র আইন সংক্রান্ত জাতিসংঘ কনভেনশন (UNCLOS) অনুযায়ী হরমুজ একটি আন্তর্জাতিক প্রণালী যেখানে Transit Passage-এর অধিকার রয়েছে। প্রণালী বন্ধ করা বা হুমকি দেওয়া শুধু ইরান-ইসরায়েল বিষয় নয়, এটি বৈশ্বিক বাণিজ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তার উপর হামলা। বিশ্বের ২০% তেল এই পথে যায়। বাংলাদেশের মতো জ্বালানি আমদানিকারক দেশের জন্য এর মূল্য সরাসরি জনজীবনে আঘাত হানে।
একজন মার্কিন কর্মকর্তা বলছেন, নিষেধাজ্ঞা ইরানকে আরও ভালো শর্তে রাজি করাবে। কিন্তু মধ্যস্থতাকারী দেশের সতর্কবাণী প্রণিধানযোগ্য — এই যুদ্ধ আমেরিকান জনগণের মধ্যেও অজনপ্রিয়, এবং দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকা কঠিন। কূটনীতি ছাড়া অর্থনৈতিক চাপ শুধু সাধারণ ইরানিদের কষ্ট বাড়ায়, শাসনকে শক্তিশালী করে।
৪. বৈরুতে মার্কিন-হিজবুল্লাহ যোগাযোগ: বাস্তবতা বনাম নীতি
লেবাননের MTV-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাষ্ট্রদূত মিশেল ইসাকে হিজবুল্লাহর জ্যেষ্ঠ ব্যক্তিদের সাথে কথা বলার অনুমতি দেওয়া হয়েছে, যাতে ইসরায়েল-লেবানন নিরস্ত্রীকরণ চুক্তি বাস্তবায়ন করা যায়।
একজন সুশাসন বিশ্লেষক হিসেবে আমি এটিকে দ্বৈতভাবে দেখি:
- ইতিবাচক দিক: বাস্তবতাকে স্বীকার করা। হিজবুল্লাহকে বাদ দিয়ে লেবাননে কোনো নিরাপত্তা ব্যবস্থা টিকবে না। সরাসরি যোগাযোগ ভুল বোঝাবুঝি কমায়।
- ঝুঁকি: মার্কিন আইনে হিজবুল্লাহ একটি সন্ত্রাসী সংগঠন। রাষ্ট্রদূত পর্যায়ে যোগাযোগ নীতিগত অসঙ্গতি তৈরি করে এবং লেবাননের সার্বভৌমত্বকে পাশ কাটিয়ে যেতে পারে, যদি লেবানন সরকারকে বাদ দেওয়া হয়।
টেকসই সমাধান হলো — লেবানন রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করা, কোনো গোষ্ঠীকে নয়।
৫. গাজায় যুদ্ধবিরতির মধ্যেও হত্যা
IDF-এর বিবৃতি: “দুই সন্ত্রাসী অপারেটিভ সম্প্রতি সৈন্য ও বেসামরিকদের উপর হামলা এগিয়ে নিয়েছে এবং হামাসের সক্ষমতা পুনরুদ্ধার করেছে, যুদ্ধবিরতি পদ্ধতিগতভাবে লঙ্ঘন করে। হুমকি অপসারণের জন্য হামলা চালানো হয়েছে।”
⚖️ IHL-এর দৃষ্টিতে
যুদ্ধবিরতি (Ceasefire) একটি আইনি প্রতিশ্রুতি। এর লঙ্ঘন যেই করুক, প্রতিক্রিয়া হতে হবে আনুপাতিক, সামরিক প্রয়োজনীয়তা ও পার্থক্য নীতির ভিত্তিতে। “হুমকি অপসারণ” একটি অস্পষ্ট শব্দ যা বিচারবহির্ভূত হত্যাকে বৈধতা দেওয়ার জন্য ব্যবহার করা যায় না। গাজায় প্রতিটি জীবন — ফিলিস্তিনি বা ইসরায়েলি — সুরক্ষার যোগ্য।
৬. ছায়া কূটনীতি ও জবাবদিহিতার সংকট
এই দিনের সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর দুটি প্রকাশ একে অপরের আয়না:
ক) রোনেন বার-এর সরাসরি চ্যানেল: শিন বেত প্রধান ২০২৩-এর অক্টোবর থেকে ২০২৫-এর ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সরাসরি হামাস নেতৃত্বের সাথে জিম্মি মুক্তি নিয়ে আলোচনা করেছেন — প্রধানমন্ত্রী ও যুদ্ধকালীন মন্ত্রিসভার অনুমোদনে। এটি প্রমাণ করে, মধ্যস্থতাকারী ছাড়া সরাসরি আলোচনা কখনও কখনও বেশি কার্যকর।
খ) শ্লোমি ফোগেল-এর গোপন চ্যানেল: ২০১৪ সালে অপারেশন প্রোটেক্টিভ এজ চলাকালে, যখন তিন জেনারেল ও শিন বেত প্রধান কায়রোতে আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনা করছিলেন, তখন প্রধানমন্ত্রীর ব্যবসায়িক সহযোগী ফোগেল গাজায় হামাসের গাজি হামাদের সাথে গোপন আলোচনা চালাচ্ছিলেন। নিরাপত্তা কর্মকর্তারা দুবার প্রধানমন্ত্রীকে জিজ্ঞেস করলে তিনি “জানি না” বলেন, এবং জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ প্রধান ইয়োসি কোহেনকে ফোন করে থামাতে বলেন। কিন্তু ফোগেল থামেননি। পরে তিনি “ডজন ডজন পৃষ্ঠার” নথি বের করে বলেন, তিনি অনুমতি নিয়েই করছেন।
একজন সুশাসন বিশ্লেষক হিসেবে আমি বলি — পার্থক্য অনুমোদনে নয়, স্বচ্ছতায়। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান যখন অনুমোদিতভাবে আলোচনা করে, তার নথি থাকে, জবাবদিহিতা থাকে। যখন একজন ব্যক্তিগত ব্যবসায়ী প্রধানমন্ত্রীর নামে ছায়া চ্যানেল চালায়, তখন গণতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এটি ১৯৯৮ সালে রোনাল্ড লডারকে দিয়ে সিরিয়ার হাফেজ আল-আসাদের সাথে গোপন আলোচনার প্যাটার্নের পুনরাবৃত্তি।
৭. অর্থনৈতিক যুদ্ধ: চীনা ব্যাংকের উপর নিষেধাজ্ঞার হুমকি
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ওভাল অফিসে বলেন, “কে বলল আমি [চীনা ব্যাংককে] নিষেধাজ্ঞা দিচ্ছি না? আপনি জানেন না আমি করছি কিনা... আমাকে কি সব ঘোষণা করতে হবে?”
সেকেন্ডারি স্যাংশন মানে — তৃতীয় দেশের ব্যাংককে বলা, “তুমি ইরানের সাথে ব্যবসা করলে আমেরিকার বাজার হারাবে।” এটি আন্তর্জাতিক আইনে বিতর্কিত, কারণ এটি এক দেশের আইনকে অন্য দেশের উপর চাপিয়ে দেয় (extraterritoriality)। এর ফলে বৈশ্বিক আর্থিক ব্যবস্থা বিভক্ত হয়, এবং বাংলাদেশের মতো দেশগুলোর জন্য লেনদেনের খরচ বাড়ে। নিষেধাজ্ঞা যদি লক্ষ্যভিত্তিক না হয়ে সামগ্রিক হয়, তবে তা সাধারণ মানুষের ওষুধ ও খাদ্য নিরাপত্তাকেও আঘাত করে — যা মানবাধিকার লঙ্ঘন।
৮. পশ্চিম তীরে ৩৫,০০০ মানুষের বাস্তুচ্যুতি
সরকার হাইকোর্টকে জানিয়েছে, জানুয়ারি ২০২৫ থেকে শুরু হওয়া সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানে খালি করা জেনিন, তুলকারেম ও নুর আল-শামস শিবিরে সেনাবাহিনী থাকবে, কারণ সেনাবাহিনী মনে করে ফিরে গেলে সশস্ত্র গোষ্ঠী ফিরে আসবে। Association for Civil Rights in Israel এর আবেদনে বলা হয়, ৩৫,০০০ মানুষ এখন মানবিক সহায়তার উপর নির্ভরশীল।
⚖️ চতুর্থ জেনেভা কনভেনশন, অনুচ্ছেদ ৪৯
দখলকৃত অঞ্চল থেকে বেসামরিক জনগণকে জোরপূর্বক স্থানান্তর নিষিদ্ধ, যদি না সামরিক প্রয়োজন বা জনগণের নিরাপত্তার জন্য সাময়িকভাবে অপরিহার্য হয়। কিন্তু ৮ মাসের বেশি সময় ধরে পুরো শিবির খালি রাখা এবং ফিরতে না দেওয়া সাময়িক নয়, এটি স্থায়ী বাস্তুচ্যুতি — যা যুদ্ধাপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে (রোম সংবিধি ৮(২)(b)(viii))।
নিরাপত্তা ও মানবাধিকার পরস্পরবিরোধী নয়। বসতি স্থাপনকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে ফিলিস্তিনি বেসামরিকদের অধিকার হরণ করতে হবে — এই যুক্তি টেকসই শান্তি আনে না।
৯. আন্তর্জাতিক আইনের কাঠামো
এই সমস্ত ঘটনাকে একসাথে বিচার করলে পাঁচটি আইনি স্তম্ভ ভেঙে পড়ছে:
- বলপ্রয়োগ নিষিদ্ধকরণ: UN Charter 2(4) - রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে হুমকি বা বলপ্রয়োগ নিষিদ্ধ।
- আত্মনিয়ন্ত্রণ: UN Charter 1(2) - ইরানি, ফিলিস্তিনি, লেবানিজ জনগণের নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার।
- আন্তর্জাতিক মানবিক আইন: যুদ্ধবিরতি, পার্থক্য, আনুপাতিকতা, সতর্কতা।
- দখলদারি আইন: The Hague Regulations, GCIV - দখলদার শক্তির দায়িত্ব বেসামরিকদের সুরক্ষা।
- সমুদ্র আইন: UNCLOS - হরমুজে Transit Passage অবাধ রাখা।
১০. মানবিক ও মানব নিরাপত্তার প্রভাব
একজন মানবাধিকার রক্ষাকর্মী হিসেবে আমি প্রতিটি সংখ্যার পেছনে মানুষকে দেখি:
— তেহরানে একজন মা, যিনি নিষেধাজ্ঞার কারণে সন্তানের ওষুধ কিনতে পারছেন না।
— গাজার শাতি শিবিরে একজন কিশোর, যে যুদ্ধবিরতির মধ্যেও বোমার শব্দে ঘুমাতে পারে না।
— জেনিন শিবিরের একজন বৃদ্ধ, যিনি ৩৫,০০০ জনের সাথে তাঁবুতে থাকেন এবং জানেন না বাড়ি ফিরতে পারবেন কিনা।
— বৈরুতে একজন জেলে, যার নৌকা হরমুজ সংকটের কারণে তেলের দাম বাড়ায় অচল।
এদের কারও নিরাপত্তা “শাসনের পতন” দিয়ে আসবে না। তাদের নিরাপত্তা আসবে যখন আমরা মানুষকে কেন্দ্রে রাখব, শাসনকে নয়।
১১. টেকসই শান্তির পথ: ১২ দফা নীতি সুপারিশ
১২. উপসংহার: আলো আসবে বোমা থেকে নয়, আইন থেকে
বার্নিয়া বলেছেন, “আলোকিত পশ্চিমা বিশ্ব এটি চায়, যার নেতৃত্বে রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল, যারা আগের চেয়ে বেশি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।”
একজন বাংলাদেশি মানবাধিকার রক্ষাকর্মী হিসেবে বলি — আলোকিত বিশ্ব মানে সেই বিশ্ব নয়, যে বিশ্ব বোমার আলোয় পথ দেখে। আলোকিত বিশ্ব মানে সেই বিশ্ব, যে বিশ্ব আন্তর্জাতিক আইনের আলোয় পথ দেখে।
ইরানের শাসনের সমালোচনা করার অধিকার ইরানি জনগণের আছে। ইসরায়েলের নিরাপত্তার উদ্বেগ বৈধ। ফিলিস্তিনিদের রাষ্ট্র ও মর্যাদার আকাঙ্ক্ষা বৈধ। লেবাননের সার্বভৌমত্ব বৈধ। কিন্তু কোনো একটি বৈধ উদ্বেগ অন্য একটি জনগোষ্ঠীর উপর অবৈধ বলপ্রয়োগকে বৈধ করে না।
আমাদের কোনো উপায় নেই — এই কথাটি সত্য নয়। আমাদের উপায় আছে। সেই উপায় হলো কূটনীতি, জবাবদিহিতা এবং মানবাধিকার।
আমরা যদি সত্যিই ইরানি জনগণের জন্য “এক ঝলক আলো” চাই, তবে আমাদের উচিত তাদের উপর আরও অন্ধকার না ফেলা।
মিনহাজ সামাদ চৌধুরী
মানবাধিকার রক্ষাকর্মী ও সুশাসন এবং পাবলিক পলিসি বিশ্লেষক
সিলেট, বাংলাদেশ

No comments:
Post a Comment
Please validate CAPTCHA