সংস্কারের প্রতিশ্রুতি,জবাবদিহিতার পরীক্ষা
মানবাধিকার কমিশন, গুমের প্রতিকার ও নিরাপত্তা খাতের পরিবর্তনকে বিচার করতে হবে একটি প্রশ্নে: রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহারের শিকার মানুষ কি স্বাধীনভাবে অভিযোগ জানিয়ে কার্যকর প্রতিকার পাবেন?
কোনো মানুষকে তুলে নেওয়ার পর তাঁর পরিবার যদি জানতে না পারে তিনি কোথায়, কার হেফাজতে এবং কোন অভিযোগে আটক—তখন রাষ্ট্রের সবচেয়ে জরুরি পরীক্ষা শুরু হয়। সেই পরীক্ষার ফল নির্ভর করে দরজায় দরজায় ঘোরা পরিবারটির জন্য একটি বিশ্বাসযোগ্য দরজা খোলা আছে কি না। যেখানে অভিযোগ গ্রহণ করা হবে, প্রমাণ রক্ষা করা হবে এবং অভিযুক্ত যত ক্ষমতাবানই হোক, তদন্ত এগোবে।
মানবাধিকারকর্মী ও সুশাসন–জননীতি বিশ্লেষক হিসেবে আমার মূল্যায়নের কেন্দ্র এই নাগরিক অভিজ্ঞতা। সংস্কারের সাফল্য মাপতে চাই মানুষের নিরাপত্তা, প্রতিকারের সহজলভ্যতা এবং ক্ষমতাকে প্রশ্ন করার বাস্তব সুযোগ দিয়ে। রাজনৈতিক নেতৃত্বের পরিবর্তনের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানও কতটা বদলাল—তার প্রমাণ থাকতে হবে আইন, বাজেট, নিয়োগ ও দৈনন্দিন আচরণে।
তিনটি পরিবর্তন, একটি মৌলিক উদ্বেগ
HRW-এর ২২ সেপ্টেম্বর তারিখাঙ্কিত প্রকাশনাটি—যার মূল বিবৃতিতে ২৩ সেপ্টেম্বরের উল্লেখ আছে—বলছে, সেপ্টেম্বরের তিনটি আইন মানবাধিকার সুরক্ষাকে দুর্বল করেছে। সংস্থাটির অভিযোগ: কমিশনের স্বাধীনতা ও সরাসরি তদন্ত সীমিত হয়েছে; গুম তদন্তে অন্য নিরাপত্তা সংস্থাকে দায়িত্ব দেওয়ার ব্যবস্থা এসেছে; ঊর্ধ্বতনের দায়ের মানদণ্ড সংকুচিত হয়েছে। র্যাবের জনবল, ক্ষমতা ও সম্পদ নতুন নামের বাহিনীতে স্থানান্তরকেও তারা প্রকৃত সংস্কার হিসেবে দেখছে না। তবে কমিশন সব পরিস্থিতিতে অনুসন্ধান করতে অক্ষম—এমন সরল সিদ্ধান্তও সঠিক নয়: HRW নিজেই অসন্তোষজনক বা অনুপস্থিত প্রতিবেদনের ক্ষেত্রে অনুসন্ধানের একটি অস্পষ্ট সুযোগের কথা বলেছে।[১]
মানবজমিন ২৩ সেপ্টেম্বর এই উদ্বেগগুলো বাংলায় তুলে ধরেছে। মূল উৎস ও তার সংবাদভিত্তিক উপস্থাপনকে দুটি স্বতন্ত্র অনুসন্ধানের প্রমাণ হিসেবে গণনা করা উচিত নয়। দায়িত্বশীল জনআলোচনায় উৎসের এই সম্পর্ক স্পষ্ট রাখাও জবাবদিহিতার অংশ।[২]
কাগজে ক্ষমতা থেকে বাস্তব প্রতিকার
সরকারি আইনভান্ডারে থাকা গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ, ২০২৫-এর ৭ ধারায় কমিশনের অনুসন্ধান, তদন্ত এবং আটককেন্দ্রসহ বিভিন্ন স্থান পরিদর্শনের দায়িত্ব ছিল। ৮ ধারায় অভিযোগ গ্রহণ ও তদন্তের প্রক্রিয়া এবং ১০ ধারায় নিখোঁজ ব্যক্তির সন্ধান অব্যাহত রাখার বিধান দেখা যায়। একই সরকারি পৃষ্ঠায় অধ্যাদেশটির কার্যকারিতা লোপ পাওয়ার কথাও স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা আছে। এটি পূর্ববর্তী কাঠামো বোঝার প্রাথমিক উৎস; একে বর্তমান কার্যকর আইন হিসেবে উপস্থাপন করা যাবে না।[৩]
এই পার্থক্যের তাৎপর্য গভীর। একটি অভিযোগ কোথায় জমা হবে, কে তদন্তকারী নিয়োগ করবে, কে নথি চাইতে পারবে এবং কার অনুমতিতে আটককেন্দ্রে প্রবেশ করা যাবে—প্রতিটি প্রশ্ন নাগরিকের অপেক্ষার সময় ও নিরাপত্তাকে প্রভাবিত করে। তাই নতুন ও পুরোনো ব্যবস্থার তুলনা হওয়া প্রয়োজন ধারা ধরে, প্রকাশ্য ব্যাখ্যাসহ।
শুধু অভিযোগ নেওয়ার কাউন্টার থাকলেই প্রতিকারব্যবস্থা সম্পূর্ণ হয় না। অভিযোগ গ্রহণের প্রমাণ, জরুরি ঝুঁকি মূল্যায়ন, তদন্তের সময়সীমা, অগ্রগতির তথ্য এবং সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করার পথ থাকতে হবে। রাষ্ট্রের কাছে মানুষ যেন নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করার সুযোগ পান, আর রাষ্ট্রও যেন তাঁর কাছে নিজের সিদ্ধান্তের কারণ ব্যাখ্যা করে।
স্বাধীন কমিশনের তিন ভিত্তি: নিয়োগ, সম্পদ ও অনুসন্ধান
জাতীয় মানবাধিকার প্রতিষ্ঠানগুলোর আন্তর্জাতিক জোট GANHRI প্যারিস নীতিমালার আলোচনায় স্বাধীনতা, বহুত্ববাদ ও কার্যকারিতাকে গুরুত্ব দেয়। পর্যাপ্ত আইনগত ক্ষমতা, প্রমাণ সংগ্রহের সুযোগ এবং প্রয়োজনীয় অর্থ ও জনবলও তার মানদণ্ডের অংশ।[৪]
বাংলাদেশের জন্য এর বাস্তব অর্থ হলো, কমিশনের নেতৃত্ব নির্বাচনের মানদণ্ড প্রকাশ্য হতে হবে; রাজনৈতিক আনুগত্যের বদলে যোগ্যতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা মূল্যায়নের সুযোগ রাখতে হবে। নিয়োগের ফলের পাশাপাশি প্রক্রিয়াটিও জনআস্থা অর্জন করবে। নারী, সংখ্যালঘু, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অভিজ্ঞতা কমিশনের কাজকে সমৃদ্ধ করতে পারে।
নিজস্ব তদন্তকারী, ফরেনসিক সহায়তা, নিরাপদ তথ্যব্যবস্থা ও মাঠপর্যায়ের উপস্থিতি ছাড়া স্বাধীনতা অনেক সময় ঘোষণায় আটকে থাকে। আবার আর্থিক স্বায়ত্তশাসনের সঙ্গে স্বচ্ছ নিরীক্ষা থাকা প্রয়োজন। কমিশন নির্বাহী বিভাগের প্রভাবমুক্ত থাকবে, নিজের ব্যয় ও সিদ্ধান্তের বিষয়ে জনগণের কাছে জবাবও দেবে।
গুমের তদন্তে স্বার্থের সংঘাত ঠেকাতে হবে
এক সংস্থার বিরুদ্ধে অভিযোগ অন্য সংস্থা তদন্ত করলেই স্বাধীনতা নিশ্চিত হয় না। মূল্যায়ন করতে হবে তদন্তকারী কর্তৃপক্ষের নিয়োগ, প্রশাসনিক অধীনতা, পেশাগত সম্পর্ক এবং প্রমাণে প্রবেশের স্বাধীনতা। একইভাবে, কোনো সংস্থার সঙ্গে সম্পর্ক আছে বলেই প্রত্যেক তদন্তকারীকে পক্ষপাতদুষ্ট বলা যাবে না। দরকার ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান উভয় পর্যায়ে স্বার্থের সংঘাত শনাক্ত ও দূর করার নিয়ম।
আমার প্রস্তাব হলো, গুরুতর অভিযোগে স্বাধীন বেসামরিক তদন্তের সক্ষমতা গড়ে তোলা, তদন্তে বাধা দেওয়ার অভিযোগ পরীক্ষা করা এবং সাক্ষীর নিরাপত্তাকে শুরু থেকেই অগ্রাধিকার দেওয়া। তদন্তের অগ্রগতি পরিবারকে জানাতে হবে এমনভাবে, যাতে তাঁদের ব্যক্তিগত তথ্য বা নিরাপত্তা ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।
ঊর্ধ্বতনের দায় নির্ধারণেও সতর্কতা জরুরি। পদমর্যাদাই অপরাধের প্রমাণ নয়; আবার কেবল লিখিত নির্দেশ খুঁজে পেলেই দায়িত্বের সব প্রশ্নের উত্তর মেলে না। কে কী জানতেন, কার কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ছিল, কোন প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব ছিল—এসব যাচাই করার উপযোগী আইনি কাঠামো প্রয়োজন। প্রযোজ্য আন্তর্জাতিক ও দেশীয় মানদণ্ডের পার্থক্য বিবেচনা করে আইন পর্যালোচনা করতে হবে; কোনো সংবাদসারাংশকে পূর্ণাঙ্গ আইনি পরীক্ষার বিকল্প ধরা যাবে না।
নাম পরিবর্তনের পর কী বদলেছে, তা দেখানোর দায়িত্ব রাষ্ট্রের
যেকোনো নিরাপত্তা বাহিনীর পুনর্গঠনের গ্রহণযোগ্যতা নির্ভর করবে কাজের পদ্ধতি ও তদারকির পরিবর্তনের ওপর। নাগরিক জানতে চাইবেন: আটক ব্যক্তির পরিচয় ও অবস্থান কীভাবে নথিভুক্ত হয়? অভিযোগ উঠলে প্রমাণ কে সংরক্ষণ করে? বলপ্রয়োগের ঘটনা কে পরীক্ষা করে? ভুক্তভোগী কোথায় নির্ভয়ে অভিযোগ জানাতে পারেন?
দক্ষ অপরাধ দমন রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয় দায়িত্ব। সেই দক্ষতার স্থায়িত্বের জন্য মানুষের সহযোগিতা ও বিশ্বাস দরকার। অভিযোগ উপেক্ষিত হলে সৎ কর্মকর্তারাও সন্দেহের মুখে পড়েন। স্বাধীন তদন্ত তাঁদের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ পরীক্ষা করার এবং প্রকৃত অপরাধীর দায় আলাদা করার সুযোগ তৈরি করতে পারে। মানবাধিকারসম্মত কার্যপদ্ধতি তাই পেশাদার নিরাপত্তা ব্যবস্থার অপরিহার্য অংশ।
একই অধিকার, সবার জন্য
আমার কাছে মানবাধিকারের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা আসে রাজনৈতিকভাবে অপ্রিয় মানুষের ক্ষেত্রে। যাঁর মতের সঙ্গে একমত নই, তাঁরও নির্যাতনমুক্ত থাকা, অভিযোগ জানার এবং ন্যায়সংগত বিচার পাওয়ার অধিকারকে সমর্থন করতে হবে। অপরাধের অভিযোগ তদন্ত হবে প্রমাণের ভিত্তিতে; পরিচয় বা দলীয় সম্পর্ক দিয়ে ব্যক্তির দায় স্থির করা গ্রহণযোগ্য নীতি হতে পারে না।
এই একই মানদণ্ড প্রযোজ্য সংখ্যালঘু পরিবার, সাংবাদিক, শ্রমিক, শিক্ষার্থী এবং প্রত্যন্ত এলাকার দরিদ্র অভিযোগকারীর জন্য। ঢাকার প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার সিলেটের কোনো পরিবারের কাছে অর্থবহ হবে তখনই, যখন অভিযোগ জানাতে তাঁকে প্রভাবশালীর সুপারিশ বা ব্যয়বহুল অনানুষ্ঠানিক মধ্যস্থতার ওপর নির্ভর করতে হবে না।
সংস্কারের একটি পরিমাপযোগ্য কর্মপরিকল্পনা
নিচের সময়সীমাগুলো লেখকের প্রস্তাবিত অগ্রাধিকার; এগুলো বর্তমান আইনের নির্ধারিত সময়সীমা বা ঘোষিত সরকারি কর্মসূচি নয়। লক্ষ্য হলো প্রকাশ্য অঙ্গীকারকে যাচাইযোগ্য অগ্রগতিতে রূপ দেওয়া।
| সময় ও অগ্রাধিকার | প্রস্তাবিত কাজ | যে প্রমাণে অগ্রগতি বোঝা যাবে |
|---|---|---|
| প্রথম ৩০ দিন আইনের ব্যাখ্যা | নতুন আইন ও পূর্ববর্তী বিধানের তুলনামূলক বিবরণ প্রকাশ; বিতর্কিত বিষয়ে সরকারের ধারাভিত্তিক ব্যাখ্যা। | সবার জন্য উন্মুক্ত পাঠ, পরিবর্তনের তালিকা ও প্রশ্নোত্তর। |
| প্রথম ৬০ দিন অংশগ্রহণমূলক পর্যালোচনা | ভুক্তভোগী পরিবার, বিশেষজ্ঞ, বিরোধী দল ও নাগরিক সংগঠনের মতামত নেওয়া; নিরাপদ সাক্ষ্যদানের ব্যবস্থা। | শুনানির সারসংক্ষেপ এবং গৃহীত ও অগ্রাহ্য সুপারিশের কারণ। |
| প্রথম ৯০ দিন প্রতিকারের সক্ষমতা | স্বাধীন তদন্ত, জনবল, বাজেট এবং প্রয়োজনীয় আইন সংশোধনের পরিকল্পনা প্রকাশ। | দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান, ব্যয়, বাস্তবায়নসূচি ও অভিযোগ নিষ্পত্তির পরিমাপক। |
| নিয়মিত ফলাফল মূল্যায়ন | গোপনীয়তা রক্ষা করে অভিযোগ, অনুসন্ধান, প্রতিকার ও সুপারিশ বাস্তবায়নের সামষ্টিক তথ্য প্রকাশ। | অপেক্ষার সময়, অগ্রগতি, অনুসরণমূলক ব্যবস্থা ও স্বাধীন নিরীক্ষা। |
শুধু নিষ্পত্তির সংখ্যা দিয়ে সাফল্য মাপলে তাড়াহুড়া করে অভিযোগ বন্ধ করার প্রণোদনা তৈরি হতে পারে। তাই মূল্যায়নে সিদ্ধান্তের গুণমান, অভিযোগকারীর নিরাপত্তা, পুনর্বিবেচনার সুযোগ এবং প্রতিকারের বাস্তব ফলও অন্তর্ভুক্ত করা উচিত।
সরকারের বক্তব্য: প্রতিকারের অগ্রগতি ও স্বাধীনতার প্রশ্ন
২৩ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত বাসসের একটি ফিচারে আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামানের বক্তব্য পাওয়া যায়। সেখানে গুমের শিকার পরিবারের সম্পত্তি ব্যবহার ও বণ্টনের সুযোগ, ক্ষতিপূরণ এবং দণ্ডিত ব্যক্তির কাছ থেকে আদায় সম্ভব না হলে রাষ্ট্রের অর্থ প্রদানের দায়িত্বের বিবরণ রয়েছে। মানবাধিকার কমিশন সম্পর্কে মন্ত্রীর যুক্তি: এটি ফৌজদারি তদন্ত সংস্থা নয়; অধিকার লঙ্ঘন অনুসন্ধান করে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করাই তার কাজ। বাসস কমিশনের সমন জারি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সংক্রান্ত তদন্তের সুযোগও উল্লেখ করেছে। এগুলো সংবাদসূত্রে পাওয়া সরকারি ব্যাখ্যা ও আইনের বিবরণ; পূর্ণ গেজেটের বিকল্প নয়।[৫]
ভুক্তভোগী পরিবারের জীবিকা ও সম্পত্তির অনিশ্চয়তা দূর করার উদ্যোগকে গুরুত্ব দিতে হবে। পরিবারের আয় বন্ধ হয়ে গেলে সন্তানদের পড়াশোনা, চিকিৎসা এবং দৈনন্দিন ব্যয় চালানোর সমস্যা অপেক্ষা করে না। তবে অর্থপ্রাপ্তির ব্যবস্থা এবং স্বাধীন তদন্তের ক্ষমতা দুটি পৃথক বিষয়। একটির অগ্রগতি অন্যটির দুর্বলতা সম্পর্কে ওঠা প্রশ্নের নিষ্পত্তি করে না।
কমিশনকে অপরাধের বিচার বা পুলিশের সব কাজ করার দায়িত্ব দিতে হবে—এমন দাবি ছাড়াও তার স্বাধীন অনুসন্ধানের প্রয়োজন প্রতিষ্ঠা করা যায়। গুরুত্বপূর্ণ হলো: কমিশন নিজের উদ্যোগে প্রমাণ সংগ্রহ করতে পারবে কি না, সংশ্লিষ্ট বাহিনীর অনুমতির ওপর নির্ভর না করে তথ্য পাবে কি না এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে উপযুক্ত কর্তৃপক্ষকে কার্যকরভাবে সম্পৃক্ত করতে পারবে কি না। অনুসন্ধান, ফৌজদারি তদন্ত, সুপারিশ ও বিচার—এসব পৃথক দায়িত্ব; সমন্বয়ের নামে কোনো স্তরেই জবাবদিহিতার শূন্যতা রাখা উচিত নয়।
বাসসের লেখায় সরকারের আমলে গুম না হওয়ার দাবি এবং UNDP-এর প্রতিনিধির অভিনন্দন পাওয়ার কথাও মন্ত্রীর বক্তব্য হিসেবে রয়েছে। প্রথম দাবিটি নির্দিষ্ট সময়সীমা ও অভিযোগের স্বাধীন যাচাই দাবি করে; দ্বিতীয়টির ক্ষেত্রে মূল বার্তার ভাষা ও পরিসর দেখা প্রয়োজন। কোনো অভিনন্দনবার্তার উল্লেখকে আইনের প্রতিটি ধারার প্রতি জাতিসংঘের পূর্ণ সমর্থন বলা যায় না।[৫]
আরও একটি পাঠগত সতর্কতা প্রয়োজন। বাসসের প্রতিবেদনে মন্ত্রীর বক্তব্যে ২৪ ঘণ্টার বেশি অবৈধ আটকের প্রসঙ্গ এসেছে। সেই বক্তব্য থেকে ২৪ ঘণ্টার কম সময় কাউকে গোপনে আটক রাখা অনুমোদিত—এমন সিদ্ধান্ত টানা যাবে না। অপরাধের সংজ্ঞা, সময়সীমার ভূমিকা ও আদালতের এখতিয়ার মূল আইনের নির্ভুল পাঠেই নির্ধারণ করতে হবে।
এই তুলনা থেকে আমার মূল্যায়ন: ভুক্তভোগীর অর্থনৈতিক প্রতিকার, স্বাধীন অনুসন্ধান এবং অভিযুক্তের ন্যায়সংগত বিচার—তিনটিকেই একসঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে। HRW-এর সমালোচনা ও সরকারের ইতিবাচক মূল্যায়ন উভয়কে মূল আইন এবং বাস্তব ফলাফলের ভিত্তিতে পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
যে রাষ্ট্রকে বিশ্বাস করা যায়
বাংলাদেশের জন্য প্রয়োজন এমন প্রতিষ্ঠান, যার ওপর আস্থা রাখতে সরকারপন্থী হতে হয় না। যে কমিশনের কাছে ক্ষমতাবান ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ করা যায়; যে তদন্ত নিজের পেশাগত স্বাধীনতা বজায় রাখতে পারে; যে নিরাপত্তা ব্যবস্থা মানুষের মর্যাদা রক্ষাকে দায়িত্বের অংশ হিসেবে গ্রহণ করে।
রাষ্ট্রের শক্তির সবচেয়ে বিশ্বাসযোগ্য প্রকাশ হলো ভুল সংশোধনের ক্ষমতা। কোনো পরিবার যেন আর প্রিয়জনের অবস্থান জানতে গিয়ে অসহায় নীরবতার মুখে না পড়ে—এই লক্ষ্য সামনে রেখেই সংস্কারের মূল্যায়ন করতে হবে। নাগরিক যেন বলতে পারেন: আমার পরিচয় যা-ই হোক, আমার অভিযোগ শোনা হবে, প্রমাণ পরীক্ষা হবে এবং ন্যায়সংগত প্রতিকারের পথ খোলা থাকবে।
সূত্র ও সম্পাদকীয় স্বচ্ছতা
- Human Rights Watch: Bangladesh: New Laws Reverse Rights Protections, Empower Abusers। ওয়েব তারিখ: ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, রাত ৯টা EDT; মূল বিবৃতিতে London, September 23। সময় অঞ্চলের পার্থক্যের কারণে তারিখের এই ভিন্নতা।
- মানবজমিন: বাংলাদেশে নতুন আইনে উল্টোপথে মানবাধিকার সুরক্ষা, নিপীড়কদের ক্ষমতায়ন। ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬; পাঠকের দেওয়া পূর্ণ পিডিএফ পর্যালোচিত।
- বাংলাদেশ আইনভান্ডার: গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ, ২০২৫। ২০২৫ সনের ৭৩ নং অধ্যাদেশ। সরকারি পৃষ্ঠায় কার্যকারিতা লোপ পাওয়ার উল্লেখ রয়েছে; ঐতিহাসিক তুলনার উৎস হিসেবে ব্যবহৃত।
- GANHRI: Paris Principles। জাতীয় মানবাধিকার প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা, ক্ষমতা, বহুত্ববাদ ও সম্পদের মানদণ্ড।
- বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস), এস এম আশিকুজ্জামান: গুম প্রতিরোধ, মানবাধিকার ও সম্পত্তি হস্তান্তর আইন: ন্যায়বিচারে নতুন দিগন্ত। ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১২:৩০।
- HRW: Bangladesh country page এবং বাংলা পৃষ্ঠা। বিষয়টির প্রেক্ষাপট ও মূল প্রকাশনা শনাক্ত করতে ব্যবহৃত।

No comments:
Post a Comment
Please validate CAPTCHA