বিজ্ঞাপনের ইন্দ্রজাল ও জংলীতন্ত্রের অভয়ারণ্য: ড. ইউনূসের শাসনকাল এবং একটি আত্মঘাতী প্রজন্মের ইতিহাস
বিশ্বের খুব কম মানুষই কথার মায়াজালে মানুষকে এমন ঘোরলাগা স্বপ্নের সাগরে ভাসাতে পেরেছেন, যেমনটি পেরেছিলেন প্রফেসর মুহাম্মদ ইউনূস। তাঁর লেখা ‘এ ওয়ার্ল্ড অব থ্রি জিরোজ’ বইটির পাতা উল্টাতে উল্টাতে বাংলাদেশের তরুণরা তো বটেই, প্যারিস থেকে টোকিওর বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে থাকা হাজারো স্বপ্নবাজ ছাত্র বিশ্বাস করেছিল—দারিদ্র্য হয়তো সত্যিই জাদুঘরে চলে যাবে, কারও কোনো চাকরির প্রয়োজন হবে না, সবাই রাতারাতি উদ্যোক্তা হয়ে উঠবে এবং কার্বনহীন এক সবুজ সাম্যবাদ নেমে আসবে পৃথিবীর বুকে। সেই অলীক বিশ্বাসের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট যখন ছাত্র-জনতার অপরিমেয় রক্তের ওপর ভর করে তিনি সরকারপ্রধানের চেয়ারে বসলেন, তখন চারদিকে এক অভূতপূর্ব উন্মাদনা তৈরি হয়েছিল। সবাই ভেবেছিল, যে মানুষটি আজীবন তত্ত্ব বিক্রি করে বিশ্বজয় করেছেন, ক্ষমতা হাতে পেয়ে তিনি বাংলাদেশকে বানাবেন তাঁর স্বপ্নের প্রথম জীবন্ত গবেষণাগার।
কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনা কোনো এনজিওর বার্ষিক সাধারণ সভা নয়। দুই বছর পর আজ যখন পেছনের দিকে তাকাই, তখন দেখা যায় এক নিদারুণ প্রবঞ্চনার ধ্বংসস্তূপ। ক্ষমতার শিখরে বসে তিনি তরুণদের সেই পবিত্র বিশ্বাসকে আধুনিক বিজ্ঞান ও গবেষণার হাতিয়ার বানাননি; উল্টো তাদের ঠেলে দিয়েছেন এক অন্ধকার গহ্বরে। আইনের শাসনের (Rule of Law) সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে রেখে দেশজুড়ে প্রতিষ্ঠা করা হলো এক পৈশাচিক ‘মবতন্ত্র’ (Rule of Mobocracy) বা জংলীতন্ত্র। যে যুবসমাজ হতে পারত বৈশ্বিক মেধার অগ্রদূত, তাদের হাতে তুলে দেওয়া হলো মব-ভায়োলেন্স আর ফেসবুক ট্রোলিংয়ের কুৎসিত অস্ত্র।
আইনের শাসনের শবযাত্রা: উৎসবমুখর মবতন্ত্র ও ধ্বংসযজ্ঞের মহড়া
একটি সভ্য রাষ্ট্রের ন্যূনতম পরিচয় হলো নাগরিকের নিরাপত্তা ও আইনের সমান প্রয়োগ। কিন্তু ইউনূস প্রশাসনের দুই বছরে আইনকে নামিয়ে আনা হয়েছিল রাজপথের উন্মত্ত মবের পদতলে। তৎকালীন সংবাদমাধ্যম ও সচিত্র প্রতিবেদনগুলোর দিকে তাকালে আজ শিউরে উঠতে হয়—কীভাবে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বাহিনীকে ঠুঁটো জগন্নাথ বানিয়ে রেখে জনতাকে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার নগ্ন ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছিল।
স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম শোকাবহ স্মৃতিচিহ্ন—ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাড়িটিকে প্রকাশ্য দিবালোকে উৎসব করে ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হলো। ইতিহাসের প্রতি ন্যূনতম শ্রদ্ধা বা রাজনৈতিক ভারসাম্য থাকলে কোনো দায়িত্বশীল সরকার এমন মধ্যযুগীয় বর্বরতা দাঁড়িয়ে দেখতে পারে না। অথচ সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে এই ঐতিহাসিক স্থাপনা রক্ষার কোনো কার্যকর নির্দেশ আসেনি; বরং নীরবতার মাধ্যমে একে এক অদ্ভুত রাজনৈতিক স্বীকৃতি দেওয়া হলো।
"আদালত ও সংবিধানকে পাশ কাটিয়ে যখন রাজপথের চিৎকার আর হিংস্র মব দিয়ে বিচার নির্ধারণের সংস্কৃতি কায়েম হয়, তখন তাকে আর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বলা যায় না—তা হয়ে ওঠে এক বিকারগ্রস্ত জংলীতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ।"
এই তাণ্ডব কেবল অতীত স্মৃতির ওপর সীমাবদ্ধ ছিল না; আঘাত হানা হলো স্বাধীন মতপ্রকাশের হৃৎপিণ্ডে। মুক্ত গণমাধ্যমের কণ্ঠ রোধ করতে দেশের প্রধান সারির জাতীয় দৈনিক প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টার-এর কার্যালয়ে ঢুকে ভাঙচুর চালানো হলো, আগুন দেওয়ার অপচেষ্টা চলল। ধর্মনিরপেক্ষ ও মেহনতি মানুষের সংস্কৃতির বাতিঘর উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর কার্যালয় আগুনে ভস্মীভূত করে দেওয়া হলো। আর একই ছকে দেশজুড়ে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বাড়িঘরে হামলা, জমি দখল ও তাদের অস্তিত্বের ওপর আক্রমণ চলতে দেওয়া হলো প্রশাসনের নাকের ডগায়। স্বয়ং নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী সরকারপ্রধানের শাসনামলে এই তাণ্ডব কোনো আকস্মিক ব্যর্থতা নয়; এটি ছিল মবতন্ত্রকে রাজনৈতিক ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করার এক নিদারুণ আপস।
জ্বালানি নীতির অন্ধিসন্ধি ও লোডশেডিংয়ের মহাসংকট: শিল্পের রক্তক্ষরণ বনাম 'জিরো কার্বন'-এর প্রহসন
বিদ্যুৎ কেবল ঘরের বাতি জ্বালানোর মাধ্যম নয়; আধুনিক যুগে বিদ্যুৎ হলো একটি দেশের অর্থনীতির রক্তপ্রবাহ। কিন্তু প্রফেসর ইউনূসের অদূরদর্শী ও সমন্বয়হীন সিদ্ধান্তের কারণে গোটা বাংলাদেশ নিক্ষিপ্ত হয়েছিল বিদ্যুতের এক ঐতিহাসিক মহাসংকটে। তৎকালীন গণমাধ্যমের অনুসন্ধান ও অনুসন্ধানী প্রতিবেদনগুলো খুললেই এর বিস্তৃত ও ভয়াবহ চিত্র ভেসে ওঠে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ শৃঙ্খল ও চুক্তিভিত্তিক দায়বদ্ধতাগুলোকে পেশাদারিত্বের সাথে মোকাবিলার বদলে গ্রহণ করা হয়েছিল হঠকারী সিদ্ধান্ত। কয়লা ও এলএনজি (LNG) আমদানির ক্ষেত্রে বৈদেশিক মুদ্রার অব্যবস্থাপনা এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী কেন্দ্রগুলোর বকেয়া মেটাতে চরম ব্যর্থতার দরুন একে একে বন্ধ হয়ে পড়েছিল জাতীয় গ্রিডের বহু বিদ্যুৎকেন্দ্র।
এর খেসারত দিতে হয়েছে দেশের লাখ লাখ সাধারণ নাগরিক ও উৎপাদন খাতকে। রাজধানী থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যন্ত ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিংয়ে জনজীবন স্থবির হয়ে পড়েছিল। সাভার, আশুলিয়া, নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রামের শিল্পাঞ্চলে গ্যাস ও বিদ্যুতের তীব্র সংকটে বন্ধ হয়ে যায় শত শত পোশাক কারখানার বয়লার। জেনারেটর চালিয়ে উৎপাদন সচল রাখতে গিয়ে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পগুলোর উৎপাদন খরচ বেড়ে যায় বহুগুণে; বিদেশি ক্রেতারা সময়মতো পণ্য না পেয়ে অর্ডার বাতিল করতে শুরু করে। একদিকে শিল্পকারখানা ধ্বংস হয়ে লাখ লাখ শ্রমিকের রুটিরুজি বন্ধ হলো, আর অন্যদিকে বিশ্বমঞ্চে তিনি ‘Zero Net Carbon’-এর তাত্ত্বিক ফুলঝুরি ছুটিয়ে বেড়ালেন। যে নেতা নিজ দেশের জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডকে সচল রাখতে পারেন না, তাঁর মুখে পরিবেশবান্ধব সবুজ অর্থনীতির বুলি মূলত জনগণের দীর্ঘশ্বাসের ওপর এক নির্মম উপহাস।
শ্রীলঙ্কা বনাম বাংলাদেশ: ঘুরে দাঁড়ানো অর্থনীতি বনাম চাকরিহীনতার মহাসমুদ্র
অনেকেই ভাবেন, গণ-অভ্যুত্থানের পর অর্থনৈতিক অস্থিরতা নাকি অনিবার্য। এই মিথ্যা সান্ত্বনাকে এক তুড়িতে উড়িয়ে দিয়েছে আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ শ্রীলঙ্কা। মনে করিয়ে দেওয়া জরুরি, শ্রীলঙ্কার অর্থনীতি যখন দেউলিয়া হয়ে পড়েছিল, তখন তারা এই বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছ থেকেই ২০০ মিলিয়ন ডলারের কারেন্সি সোয়াপ ঋণ নিয়েছিল এবং তা পরিশোধের জন্য বারবার করজোড়ে সময় বাড়িয়ে নিয়েছিল। সেই শ্রীলঙ্কায় যখন তরুণ ও সাধারণ মানুষ রাজপথে নেমে রাষ্ট্রপতির প্রাসাদ দখল করে সরকার পতন ঘটাল, তারা কিন্তু কোনো মবতন্ত্র কায়েম করেনি। তারা দ্রুত সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় ফিরে গেল, অবাধ নির্বাচনের মাধ্যমে একটি স্থিতিশীল সরকার গঠন করল এবং ভেঙে পড়া পর্যটন ও শিল্প খাতকে পুনরুজ্জীবিত করে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিল।
আর তার বিপরীতে বাংলাদেশের চিত্রটি কী? যেখানে শ্রীলঙ্কা অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে ইতিহাস গড়ল, সেখানে প্রফেসর ইউনূসের বাংলাদেশে তাঁর কথিত ‘শূন্য বেকারত্ব’ (Zero Unemployment)-এর মুখে মানুষ গণহারে কাজ ও চাকরি হারাল। বিনিয়োগে খরা, একের পর এক শিল্পকারখানা বন্ধ হওয়া, পোশাক খাতে নৈরাজ্য এবং আমদানির সঙ্কোচনে লাখ লাখ যুবক বেকারত্বের সাগরে নিক্ষিপ্ত হলো। যে মানুষটি তরুণদের দীক্ষা দিয়েছিলেন "মানুষ চাকরি করার জন্য জন্মায়নি, সবাই উদ্যোক্তা"—তাঁর শাসনামলে দেশের মানুষ ন্যূনতম চাকরিটুকু বাঁচিয়ে রাখতেই হিমশিম খেল। বিশ্বমঞ্চের বুকভরা বচনের সাথে বাস্তবের এই নিদারুণ বৈপরীত্যই তাঁর নীতিগত দেউলিয়াত্বকে উন্মোচিত করে দেয়।
'থ্রি জিরো'র ফানুস: বিশ্বমঞ্চে সাধু, নিজ দেশে দেউলিয়া
প্রফেসর ইউনূসের বৈশ্বিক প্রচারণার প্রধান বৌদ্ধিক পণ্য হলো তাঁর "Three Zero Concept": ১. শূন্য দারিদ্র্য (Zero Poverty), ২. শূন্য বেকারত্ব (Zero Unemployment), এবং ৩. শূন্য নেট কার্বন ও সম্পদ পুঞ্জীভবন বিলোপ (Zero Net Carbon / Wealth Concentration)। তিনি তরুণদের বছরের পর বছর দীক্ষা দিয়েছেন যে সামাজিক ব্যবসার জাদুতে বিশ্ব বদলে যাবে।
কিন্তু রাষ্ট্রযন্ত্রের পূর্ণ চালিকাশক্তি দুই বছর ভোগ করার পর আজ হিসাব মেলানোর সময় এসেছে। তিনি কি বাংলাদেশের জাতীয় বাজেটে তরুণদের জন্য কোনো রাষ্ট্রীয় ভেঞ্চার ক্যাপিটাল তহবিল করেছিলেন? তিনি কি দেশের গ্রামীণ নারীদের তাঁর প্রতিষ্ঠিত এনজিওগুলোর উচ্চ সুদের ঋণের ফাঁদ থেকে মুক্ত করতে পেরেছিলেন? উত্তর হলো—না। গ্রামীণ জনপদে মানুষ এখনো এক এনজিওর কিস্তি শোধ করতে আরেক এনজিওর দুয়ারে ধর্না দেয়।
একটি আধুনিক রাষ্ট্রের অর্থনীতি কেবল ক্ষুদ্র হাঁস-মুরগির খামার বা মুদি দোকান দিয়ে গড়ে ওঠে না; সেখানে প্রয়োজন ভারী শিল্প, সেমিকন্ডাক্টর প্ল্যান্ট, বিদ্যুৎ গ্রিড, আধুনিক বন্দর এবং বৃহৎ অবকাঠামো। ক্ষুদ্রঋণ দিয়ে দারিদ্র্যকে চিরস্থায়ী ক্ষুদ্র রূপ দেওয়া যায়, কিন্তু জাতিকে মধ্যম বা উচ্চ আয়ের সারিতে তোলা যায় না। নিজ দেশে যে দর্শনের কোনো রাষ্ট্রীয় রূপরেখা তিনি বাস্তবায়ন করতে পারলেন না, তা বিশ্বমঞ্চে ফেরি করে বেড়ানোকে তাত্ত্বিক প্রতারণা ছাড়া আর কী বলা যেতে পারে?
ভোটের তিন দিন আগে ওয়াশিংটন চুক্তি: ড. খলিলুরের অক্ষ ও সার্বভৌমত্বের আপস
একটি অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনের প্রাথমিক সাংবিধানিক ও নৈতিক ম্যান্ডেট হলো রাষ্ট্রের ক্ষত সারিয়ে একটি অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করা। কোনো অনির্বাচিত সরকার জনগণের স্পষ্ট সম্মতি ব্যতিরেকে রাষ্ট্রের ওপর সুদূরপ্রসারী আন্তর্জাতিক কৌশলগত বা বাণিজ্যিক বাধ্যবাধকতা চাপিয়ে দিতে পারে না। অথচ ইউনূস প্রশাসনের সবচেয়ে বিতর্কিত ও অন্ধকার অধ্যায়টি রচিত হলো ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনের ঠিক তিন দিন আগে।
গোটা দেশ যখন ভোটাধিকার প্রয়োগের প্রস্তুতি ও রাজনৈতিক উত্তেজনায় ব্যস্ত, ঠিক সেই মুহূর্তে গোপনীয়তার চাদর জড়িয়ে ওয়াশিংটনের সাথে এক চরম একপাক্ষিক বাণিজ্যিক চুক্তি সম্পাদন করা হলো। স্থানীয় তৈরি পোশাক ও সম্ভাবনাময় দেশীয় শিল্পের শুল্ক সুরক্ষা শিথিল করে, ডেটা সার্বভৌমত্বের ঝুঁকি তৈরি করে এবং অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক রেগুলেশনে একতরফা ছাড় দিয়ে গৃহীত এই চুক্তি মূলত একটি বিদেশি অক্ষের বাণিজ্যিক আধিপত্যকেই চিরস্থায়ী রূপ দিল।
এই সমীকরণের নেপথ্যের মূল কারিগর ছিলেন তৎকালীন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমান। আন্তর্জাতিক লবির কূটনৈতিক গোলকধাঁধায় তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতাকে রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক পুনর্গঠনে কাজে না লাগিয়ে ব্যবহার করা হলো এক বিশেষ অক্ষের সাথে ক্ষমতার গোপন সেতুবন্ধন তৈরিতে। অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনের নিরাপত্তা উপদেষ্টার পদ থেকে ক্ষমতার পটপরিবর্তনের পর সরাসরি রাজনৈতিক দলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ পদে আসীন হওয়া এবং তারই পথ ধরে জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের (UNGA) সভাপতি পদে আরোহণ—কোনো বিচ্ছিন্ন কূটনৈতিক কৃতিত্ব নয়। এটি ছিল জাতীয় স্বার্থের বিনিময়ে আন্তর্জাতিক মহলের তোষণের এক সুস্পষ্ট ও পরিকল্পিত পারিতোষিক।
ম্যানহাটনের হলভাড়া: রাষ্ট্র যখন ব্যক্তিগত ব্রোশিউরের মঞ্চ
কূটনৈতিক অগ্রাধিকারের এই তীব্র দেউলিয়াত্ব বিশ্বমঞ্চে নগ্নভাবে ফুটে ওঠে ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে। নিউ ইয়র্কে তখন জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের ঐতিহাসিক অধিবেশন চলছে। বিশ্বের রাষ্ট্রনায়করা যখন জলবায়ু ক্ষতিপূরণ তহবিল, তীব্র অর্থনৈতিক সংকট ও আন্তর্জাতিক সরবরাহ শৃঙ্খলের নতুন সমীকরণ নিয়ে জটিল দ্বিপাক্ষিক দরকষাকষিতে ব্যস্ত, তখন বাংলাদেশের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ইউনূসের মনোযোগ নিবদ্ধ ছিল স্রেফ আত্মপ্রচার আর ব্যক্তিগত ব্র্যান্ডিংয়ের অগভীর বৃত্তে।
জাতিসংঘ সদরদপ্তরের একটি কনফারেন্স হল ডলার খরচ করে ভাড়া নেওয়া হলো। কেন? যাতে তিনি তাঁর বহু পুরনো ক্যাসেট—সেই ক্ষুদ্রঋণ এবং তাঁর তথাকথিত ‘থ্রি জিরো কনসেপ্ট’-এর আত্মপ্রচার চালাতে পারেন। আর সেখানে দর্শক সারিতে বসে করতালি দিলেন তাঁরই সাবেক নিরাপত্তা উপদেষ্টা ও জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের নবনির্বাচিত সভাপতি ড. খলিলুর রহমান।
এক অদ্ভুত আত্মমুগ্ধতার সার্কাস! বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের সংকট, ইউরোপ-আমেরিকার বাজারে পোশাকের ভবিষ্যৎ কোটা-সুবিধা রক্ষা কিংবা রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে বৈশ্বিক শক্তিগুলোর ওপর কোনো কার্যকর চাপ সৃষ্টির চিহ্নমাত্র সেখানে ছিল না। রাষ্ট্রের প্রটোকল, কূটনৈতিক শক্তি ও জনগণের অর্থ ব্যয় করা হলো স্রেফ একজন ব্যক্তির বৈশ্বিক ইমেজ ব্র্যান্ডিংয়ের বিজ্ঞাপন বানাতে। এর চেয়ে বড় কূটনৈতিক আত্মপ্রবঞ্চনা একটি সার্বভৌম জাতির ইতিহাসে আর কী হতে পারে?
জনস্বাস্থ্য প্রশাসনের পঙ্গুত্ব ও দায়মুক্তির রাজনৈতিক চাদর
রাষ্ট্রের সুশাসনের আসল পরীক্ষা আন্তর্জাতিক সেমিনারের গালভরা বচনে হয় না; তার প্রমাণ মেলে প্রান্তিক মানুষের মৌলিক সেবা ও জীবনের নিরাপত্তায়। ইউনূস প্রশাসনের অন্যতম অন্ধকারতম দিক ছিল স্বাস্থ্য খাতের প্রশাসনিক পঙ্গুত্ব ও শীর্ষ পর্যায়ের চরম সমন্বয়হীনতা।
আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সহযোগী সংস্থাগুলোর সাথে সময়োপযোগী ভ্যাকসিন ব্যবস্থাপনা ও জাতীয় টিকাদান কর্মসূচির প্রাতিষ্ঠানিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে এক ধরনের আত্মঘাতী আমলাতান্ত্রিক স্থবিরতা তৈরি করা হয়েছিল। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নীতিগত শৈথিল্য ও সিদ্ধান্তহীনতার খেসারত দিতে হয়েছে প্রান্তিক পর্যায়ের সাধারণ পরিবারগুলোকে। সংক্রমণ ও প্রতিরোধযোগ্য ব্যাধির ঝুঁকির মুখে পড়ে শত শত মায়ের কোল খালি হলেও প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায় থেকে আসেনি কোনো প্রাতিষ্ঠানিক তদন্তের উদ্যোগ বা ন্যূনতম দায় স্বীকার।
আরও মারাত্মক বিষয় হলো, ক্ষমতার এই চরম প্রশাসনিক ব্যর্থতার বিরুদ্ধে যে জবাবদিহি হওয়ার কথা ছিল, পরবর্তী বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসে তাকে সুকৌশলে হিমঘরে পাঠিয়ে দিয়েছে। ক্ষমতার পারস্পরিক রাজনৈতিক সমঝোতা ও পৃষ্ঠপোষকতার চাদরে ঢেকে দেওয়া হয়েছে নীতি-নির্ধারকদের অতীত কর্মকাণ্ড। ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষের ক্ষোভকে আড়াল করে দায়ীদের যে আইনি ও প্রশাসনিক দায়মুক্তি দেওয়া হলো, তা বাংলাদেশের বিচারহীনতার পুরোনো সংস্কৃতিকেই আরও স্থায়ী রূপ দিল।
মেধাশূন্য যুব-রাজনীতি: অ্যালগরিদমের বন্দিশালায় একটি প্রজন্ম
একটি জাতির বিরুদ্ধে সবচাইতে বড় অপরাধ হলো তার তরুণ প্রজন্মের চিন্তা করার ক্ষমতা কেড়ে নেওয়া। চব্বিশের ঐতিহাসিক বিজয়ের পর বাংলাদেশের সামনে সুবর্ণ সুযোগ ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাগারগুলোকে আধুনিক প্রযুক্তির কেন্দ্র বানানো, তরুণদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের কারিগর হিসেবে গড়ে তোলা। কিন্তু ইউনূস প্রশাসন তরুণদের সামনে এমন কোনো প্রাতিষ্ঠানিক দিগন্ত উন্মোচন করেনি। বরং তাঁদের ক্ষোভ ও বিপ্লবী উদ্যমকে ব্যবহার করা হলো এক নিকৃষ্ট ‘অ্যালগরিদমিক ক্যাডারতন্ত্রে’।
একটি প্রদীপ্ত প্রজন্মের মনস্তাত্ত্বিক অধঃপতন
তরুণদের বুঝানো হলো—লাইব্রেরিতে বসে ইতিহাস, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বা অর্থনীতি পড়ার দিন শেষ; ফেসবুকের টাইমলাইন আর রিলসের স্ক্রলিংই তাদের জ্ঞানের আধার। বিতর্ক ও যুক্তিপূর্ণ বাগ্মিতার জায়গা দখল করে নিল রাজপথের অশালীন চিৎকার, আর ভিন্নমতকে দমন করার অন্ধ মব-ভায়োলেন্স। যে তরুণদের নোবেল বিজয়ীর হাত ধরে বিশ্বমঞ্চ কাঁপানোর কথা ছিল, তাদের হাতে ধরিয়ে দেওয়া হলো সাইবার ট্রোলিংয়ের নোংরা হাতিয়ার। একটি জাতির ভবিষ্যৎকে এর চেয়ে নিষ্ঠুরভাবে আর কীভাবে পঙ্গু করা যায়?
তারুণ্যের প্রতি দ্রোহের ইশতেহার: মবতন্ত্রের অন্ধকার ভেঙে মেধার লড়াইয়ে ফেরো
হে বাংলাদেশের তরুণ সমাজ, যাদের পবিত্র রক্তে যুগে যুগে এই মাটির মানচিত্র রক্ষা পেয়েছে—তোমাদের কাছে আজ এক নাগরিকের বিনীত কিন্তু অগ্নিগর্ভ আরজি: তোমরা আত্মপ্রবঞ্চনার ঘুম থেকে জাগো! কোনো আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের ব্যক্তিগত পিআর প্রজেক্টের অন্ধ পদাতিক হওয়ার জন্য কিংবা রাজপথে মবতন্ত্র কায়েম করার জন্য তোমরা জীবন বাজি রাখোনি।
সোশ্যাল মিডিয়ার নোংরামি, ট্রোলিং আর সস্তা স্লোগানবাজির অন্ধ কুঠুরি থেকে নিজেদের বের করে আনো। ফেসবুকের টাইমলাইন লাইব্রেরির বিকল্প নয়; অন্যের বাড়ি বা গণমাধ্যমে আগুন দেওয়া কখনো বিপ্লব হতে পারে না। স্ক্রিন ছেড়ে পড়ার টেবিলে ফেরো, গবেষণার ল্যাবে যাও, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি আর স্বনির্ভর সার্বভৌম অর্থনীতির নেতৃত্ব তোমাদেরই হাতে তুলে নিতে হবে। মেকি দেবতাদের মুখোশ খসিয়ে দেওয়ার শ্রেষ্ঠ উপায় হলো নিজেদের এমন এক অজেয় মেধাশক্তিতে রূপান্তর করা—যাকে কোনো চতুর আন্তর্জাতিক কুশীলব নিজের ক্ষমতার সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার করতে না পারে।
ইতিহাসের অমোঘ আদালত
ইতিহাস অত্যন্ত নির্মম এক আদালত। নোবেল স্মারকের চাকচিক্য কিংবা পশ্চিমা ড্রয়িংরুমের প্রশস্তিপত্র দিয়ে দেশের সার্বভৌম স্বার্থ বিলিয়ে দেওয়ার পাপ, বিদ্যুৎ সংকটে শিল্প ধ্বংস এবং মবতন্ত্র কায়েমের দায় ঢেকে রাখা যাবে না। ২০২৪ থেকে ২০২৬—এই শাসনকাল ইতিহাসে লেখা থাকবে এক 'হাতছাড়া হওয়া ঐতিহাসিক সুযোগ' হিসেবে, যেখানে সংস্কারের স্লোগানের আড়ালে চলেছিল ভূ-রাজনৈতিক তোষণ, মেধাভ্রষ্টকরণ এবং ব্যক্তিপূজার এক করুণ মহড়া।
তবে বাংলাদেশ থেমে থাকবে না। মোহের কুয়াশা যখন কেটে যাবে, তখন এই মাটির সচেতন সন্তানেরাই আবার বুক চিতিয়ে দাঁড়াবে—যেখানে কোনো বিজ্ঞাপনী বুজরুকি থাকবে না, থাকবে কেবল সত্য, মেধা, আইনের শাসন এবং অবিচল সার্বভৌমত্বের শপথ।

No comments:
Post a Comment
Please validate CAPTCHA