Skip to main content
Breaking NewsDeveloping public-interest story

Latest

Thursday, September 3, 2026

Reading time

বিদ্যুৎ ক্রয়ে স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতা: আদানি থেকে বর্জ্য-বিদ্যুৎ পর্যন্ত সুশাসনের প্রশ্ন

জ্বালানি সুশাসনবিশ্লেষণ৭ মিনিট পাঠ

বিদ্যুৎ ক্রয়ে স্বচ্ছতা ও ন্যায্যতা: আদানি থেকে বর্জ্য-বিদ্যুৎ পর্যন্ত সুশাসনের প্রশ্ন

MS
মিনহাজ সামাদ চৌধুরী
মানবাধিকার রক্ষাকর্মী ও শাসনব্যবস্থা এবং পাবলিক পলিসি বিশ্লেষক

সারসংক্ষেপ: বিদ্যুৎ কোনো বিলাসপণ্য নয়, এটি উন্নয়নের অধিকার এবং জীবনধারণের পূর্বশর্ত। সাম্প্রতিক দুটি আলোচিত বিদ্যুৎ ক্রয় হার — ভারতের আদানি থেকে আমদানি করা বিদ্যুৎ ১৪.৮৬ টাকা এবং আমিনবাজার বর্জ্য থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ ২৫ টাকা — জনমনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি করেছে। এই প্রশ্ন আবেগের নয়, এটি তথ্য, ন্যায্যতা ও জবাবদিহিতার।

০১

প্রেক্ষাপট: তথ্য কী বলছে?

দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড-এর ১৯ জুলাই ২০২৬ তারিখের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)-এর বার্ষিক প্রতিবেদন এবং বিদ্যুৎ বিভাগের আর্থিক বিবরণীতে দেখা যাচ্ছে যে আদানি গ্রুপের ঝাড়খণ্ডের গোড্ডা বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে আমদানি করা বিদ্যুতের গড় ক্রয়মূল্য দাঁড়িয়েছে প্রতি কিলোওয়াট-ঘণ্টায় ১৪.৮৬ টাকা।

২০২৪-২৫ অর্থবছরে মোট ৮০৩ কোটি কিলোওয়াট-ঘণ্টা (৮০৩০ মিলিয়ন ইউনিট) বিদ্যুৎ আমদানি করা হয়েছে যার মোট ব্যয় ১১,৯৩৩.৪৪ কোটি টাকা। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এই হার ২০২৩-২৪ অর্থবছরের ১৪.৮৭ টাকা থেকে কার্যত অপরিবর্তিত।

The Business Standard, ১৯ জুলাই ২০২৬, বিপিডিবি বার্ষিক প্রতিবেদন সূত্রে

এই মূল্যকে প্রেক্ষাপটে বুঝতে হলে অন্যান্য আমদানি উৎসের সঙ্গে তুলনা জরুরি:

উৎসপরিমাণহার (টাকা/কি.ও.ঘ.)
NVVN, ভারত
আদানি থেকে ৯৬% কম
৪৮৪ কোটি ইউনিট
৭.৫৮ টাকা
PTC India
৪৬% কম
১৬২ কোটি ইউনিট
১০.২০ টাকা
Sembcorp, ভারত
৪৫% কম
১৯২ কোটি ইউনিট
১০.২২ টাকা
নেপাল জলবিদ্যুৎ
নবায়নযোগ্য
৮.৩৫ টাকা
ভারত থেকে আমদানি গড়
আদানি ৫৯% বেশি
ভারিত গড়
৯.৩৩ টাকা

তাৎপর্য: একই আন্তঃসংযোগ ব্যবহার করে, একই মুদ্রায়, প্রায় একই সময়ে আমদানি করা বিদ্যুতের মধ্যে এই ব্যবধান কেবল বাজার-দর নয়, এটি চুক্তির কাঠামো, ঝুঁকি-বণ্টন এবং দরকষাকষির সক্ষমতার প্রশ্নও তোলে।

০২

বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ: নতুন উদ্যোগে পুরোনো প্রশ্ন

নিউ এজ-এর ২৭ আগস্ট ২০২৬ তারিখের প্রতিবেদনে জানা যায়, বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম জাতীয় সংসদে জানিয়েছেন, আমিনবাজারে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের (ডিএনসিসি) ল্যান্ডফিলে ৪২ মেগাওয়াট ক্ষমতার বর্জ্য-থেকে-বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে।

  • প্রকল্পের লক্ষ্য: ১৮ মাসের মধ্যে নির্মাণ সম্পন্ন করে ২০২৮ সালের আগস্ট-সেপ্টেম্বর নাগাদ জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ
  • সরকারের সরাসরি বিনিয়োগ নেই; বেসরকারি উদ্যোক্তা নির্মাণ ও পরিচালনা করবে
  • ডিএনসিসি মাসিক ভাড়া পাবে, পাশাপাশি জৈব সার উৎপাদন এবং কার্বন ক্রেডিটের সম্ভাবনা
— New Age, ২৭ আগস্ট ২০২৬

এই মডেল বিশ্বের অনেক শহরেই প্রচলিত। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও বিদ্যুৎ উৎপাদনকে একসূত্রে গাঁথা একটি সমন্বিত সেবা হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু যখন এর ক্রয়মূল্য ঘোষণা করা হয় ২৫ টাকা প্রতি ইউনিট, তখন প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক — কারণ দেশের গড় ক্রয়মূল্য ১২ টাকার আশপাশে।

০৩

দুটি চুক্তি, দুটি ভিন্ন বাস্তবতা: সরল তুলনার ফাঁদ

জনপরিসরে আদানির ১৪.৮৬ টাকা এবং আমিনবাজারের ২৫ টাকাকে পাশাপাশি রেখে একটি সরল সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর প্রবণতা দেখা যায়। কিন্তু সুশাসনের দৃষ্টিকোণ থেকে এটি একটি false equivalence বা ভ্রান্ত সমীকরণের ঝুঁকি তৈরি করে।

আদানি চুক্তি

বেসলোড কয়লাভিত্তিক আমদানি PPA

  • ১৬০০ মেগাওয়াট ডেডিকেটেড প্ল্যান্ট
  • দীর্ঘমেয়াদি টেক-অর-পে, ক্যাপাসিটি চার্জ
  • কয়লার দাম আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে যুক্ত
আমিনবাজার প্রকল্প

সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কনসেশন

  • ৪২ মেগাওয়াট, শহরের বর্জ্য থেকে
  • বর্জ্য সংগ্রহ, পরিবেশগত দায়, সার ও কার্বন ক্রেডিট
  • ল্যান্ডফিল, মিথেন হ্রাসের সহ-সুবিধা

একটি তুলনা ন্যায্য হতে হলে একে শুধু টাকা/কিলোওয়াট-ঘণ্টায় নয়, বরং পূর্ণ জীবনচক্র ব্যয়, পরিবেশগত বাহ্যিকতা, জ্বালানি নিরাপত্তা, এবং স্থানীয় জনস্বাস্থ্যের প্রভাব বিবেচনায় নিতে হবে। দুটিই ব্যয়বহুল কিনা — সেই প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু দুটি ভিন্ন ধরনের ব্যয়কে একই পাল্লায় মাপলে নীতিনির্ধারণ ভুল পথে যাবে।

০৪

সুশাসন ও মানবাধিকারের দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ

স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা

সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২১ অনুযায়ী রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যবহারে দায়বদ্ধতা সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা। তথ্য অধিকার আইন ২০০৯ জনগণের জানার অধিকারকে স্বীকৃতি দেয়। অথচ বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তির (PPA) পূর্ণাঙ্গ শর্ত, ক্যাপাসিটি চার্জ, জ্বালানি মূল্য সমন্বয় সূত্র, এবং হুইলিং চার্জ — যা প্রতিবেদন অনুযায়ী ০.৫২৭ টাকা থেকে কমিয়ে ০.৪৩৭ টাকা করার আবেদন নাকচ হয়েছে — এসব তথ্য সক্রিয়ভাবে প্রকাশিত নয়। যখন জনগণ জানতে পারে না কেন একই গ্রিডে একই সময়ে আমদানি করা বিদ্যুতের দামে ৫৯% ব্যবধান, তখন আস্থার সংকট তৈরি হয়।

অংশগ্রহণমূলক সিদ্ধান্ত ও শক্তি ন্যায়বিচার

আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার সনদ (ICESCR) এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য ৭ (SDG 7) সাশ্রয়ী, নির্ভরযোগ্য ও টেকসই জ্বালানির অধিকারের কথা বলে। বিপিডিবির গড় ক্রয়মূল্য যখন ১২.১ টাকা থেকে বেড়ে ১১.৩৫ টাকার প্রেক্ষাপটে আলোচিত হচ্ছে, তখন ১৪.৮৬ টাকা বা ২৫ টাকা হারে দীর্ঘমেয়াদি ক্রয় ভোক্তার ওপর ভর্তুকি ও খুচরা মূল্যের চাপ বাড়ায়। নিম্ন আয়ের পরিবার, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য এটি জীবনযাত্রার ব্যয়ের প্রশ্ন।

পরিবেশগত অধিকার

সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৮ক পরিবেশ সংরক্ষণকে রাষ্ট্রের অন্যতম কর্তব্য হিসেবে নির্ধারণ করে। আমিনবাজার প্রকল্পের ক্ষেত্রে ল্যান্ডফিলের মিথেন নিঃসরণ হ্রাস একটি ইতিবাচক দিক, কিন্তু বর্জ্য পোড়ানোর ফলে বায়ু দূষণ, ডাইঅক্সিন, এবং পার্শ্ববর্তী জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্য-অধিকার কীভাবে সুরক্ষিত হবে — তার স্বাধীন পরিবেশগত ও সামাজিক প্রভাব মূল্যায়ন প্রকাশ্যে আসা জরুরি। কয়লাভিত্তিক আমদানির ক্ষেত্রেও কার্বন ফুটপ্রিন্ট ও জলবায়ু দায়বদ্ধতা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

০৫

করণীয়: সুশাসনের পাঁচটি পথ

  1. 1

    চুক্তির সক্রিয় প্রকাশ (Active Disclosure)

    সকল বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি, সংশোধনী, এবং হুইলিং চার্জসহ আনুষঙ্গিক ব্যয় তথ্য অধিকার আইনের চেতনায় ওয়েবসাইটে প্রকাশ করতে হবে। গোপনীয়তার অজুহাতে জনস্বার্থের তথ্য আটকে রাখা চলবে না।

  2. 2

    স্বাধীন ট্যারিফ অডিট

    বিইআরসি বা তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে আদানি চুক্তিসহ সকল উচ্চমূল্যের আমদানি চুক্তির ব্যয়-কাঠামো, ক্যাপাসিটি পেমেন্ট ও জ্বালানি মূল্য সমন্বয়ের নিরপেক্ষ নিরীক্ষা।

  3. 3

    সমন্বিত ব্যয়-সুবিধা বিশ্লেষণ

    বর্জ্য-থেকে-বিদ্যুৎ প্রকল্পকে শুধু বিদ্যুৎ হিসেবে নয়, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, জনস্বাস্থ্য, মিথেন হ্রাস, সার উৎপাদন ও কার্বন ক্রেডিটসহ পূর্ণাঙ্গ সামাজিক-পরিবেশগত রিটার্ন বিবেচনায় মূল্যায়ন।

  4. 4

    প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ও বৈচিত্র্যায়ন

    ভবিষ্যৎ ক্রয়ে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা, নেপালের জলবিদ্যুৎ (৮.৩৫ টাকা) এবং আঞ্চলিক গ্রিডের সাশ্রয়ী উৎসকে অগ্রাধিকার দিয়ে আমদানি ঝুড়ি বৈচিত্র্যময় করা।

  5. 5

    নাগরিক অংশগ্রহণ

    বিদ্যুৎ মহাপরিকল্পনা, ট্যারিফ নির্ধারণ এবং বর্জ্য-বিদ্যুৎ প্রকল্পের স্থানীয় জনশুনানিতে ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠী, ভোক্তা সংগঠন ও বিশেষজ্ঞদের অর্থবহ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।

উপসংহার

১৪.৮৬ টাকা বনাম ২৫ টাকার বিতর্ক আমাদের একটি বৃহত্তর প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায় — আমরা কি বিদ্যুৎকে কেবল একটি পণ্য হিসেবে কিনছি, নাকি জনগণের অধিকার, পরিবেশ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি ন্যায্য ব্যবস্থা গড়ছি?

সুশাসন মানে শুধু কম দামে কেনা নয়, বরং কীভাবে কেনা হচ্ছে, কার স্বার্থে কেনা হচ্ছে, এবং সেই সিদ্ধান্তে জনগণের কণ্ঠস্বর কতটা আছে — তা নিশ্চিত করা। তথ্য উন্মুক্ত হলে, প্রতিযোগিতা বাড়লে, এবং নাগরিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত হলে বিদ্যুৎ খাত কেবল আলোকিতই করবে না, ন্যায়বিচারও প্রতিষ্ঠা করবে।

বিদ্যুৎ সবার জন্য — এবং সেই ‘সবার’ মধ্যে বাদ পড়বে না কেউ।

উৎস ও তথ্যসূত্র

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) বার্ষিক প্রতিবেদন অর্থবছর ২০২৪-২৫; বিদ্যুৎ বিভাগের আর্থিক বিবরণী; The Business Standard ১৯ জুলাই ২০২৬; New Age ২৭ আগস্ট ২০২৬; বিইআরসি হুইলিং চার্জ আদেশ; সংবিধান অনুচ্ছেদ ১৮ক, ২১।

MS
লেখক পরিচিতি

মিনহাজ সামাদ চৌধুরী

Minhaz Samad Chowdhury • Human Rights Defender & Governance & Public Policy Analyst

যোগাযোগ:info.hrdefender@gmail.com

এই নিবন্ধটি নীতিনির্ভর, তথ্যভিত্তিক ও ক্ষমতায়নমূলক বিশ্লেষণ। লেখকের মতামত ব্যক্তিগত।

CVB
Civic Vision Bangladesh
Independent Platform on Governance, Human Rights & Sustainable Policy • Since 2007

বস্তুনিষ্ঠ • নীতিনির্ভর • জনমুখী
© ২০২৬ Civic Vision BangladeshHuman Rights • Rule of Law • Accountability


No comments:

Post a Comment

Please validate CAPTCHA