Skip to main content
Breaking NewsDeveloping public-interest story

Latest

Wednesday, October 7, 2026

Reading time

দমন-পীড়নের দুষ্টচক্র: পুলিশি অভিযান ও বিরোধী দমনের রাজনীতি

 


বিশেষ পলিসি ফিচার• ৭ মিনিট পঠন

দমন-পীড়নের দুষ্টচক্র:
পুলিশি অভিযান ও বিরোধী দমনের চিরচেনা রাজনীতি

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ৫ অক্টোবর ২০২৬ তারিখের প্রতিবেদন “Bangladeshi Police Round Up Opposition Supporters”-এর আলোকে—ক্ষমতার হাতবদলের পরও কেন দমন-কাঠামো অক্ষত থেকে যায়, তার একটি নির্মোহ ও নীতি-নির্ধারণী পর্যালোচনা।

প্রতিবাদী জনতার সম্পাদকীয় পেন্সিল প্রচ্ছদ চিত্র
“কণ্ঠ রুদ্ধ করলেও, প্রতিবাদের ভাষা কখনো বন্দি করা যায় না!”সম্পাদকীয় স্কেচ সংস্করণ • অক্টোবর ২০২৬
CVB

মিনহাজ সামাদ চৌধুরী

লেখক ও বিশ্লেষক

মানবাধিকারকর্মী, সুশাসন ও জননীতি বিশ্লেষক এবং গবেষক। দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা খাত সংস্কার, পুলিশি জবাবদিহিতা ও নাগরিক স্বাধীনতা নিয়ে গবেষণারত। এই নিবন্ধে তিনি কোনো দলের নয়—আইনের শাসন ও নাগরিক সমতার পক্ষে সুস্পষ্ট অবস্থান নিয়েছেন।

মানবাধিকারজননীতিপুলিশ সংস্কারআইনের শাসন
!HRW প্রতিবেদনের মূল পর্যবেক্ষণ • ৫ অক্টোবর ২০২৬
Dispatch Summary
  • ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ঢাকায় জাসদের একটি প্রকাশ্য সভা থেকে প্রায় ২৯০ জনকে পুলিশ আটক করে; ক্ষমতাসীন বিএনপির যুব সংগঠন ‘যুবদল’ দাবি করে এটি নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের একটি গোপন বৈঠক।
  • আটককৃতদের মধ্যে ২৭ জনকে কেবল ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেওয়ার অভিযোগে আদালতে হাজির করে রিমান্ডে নেওয়া হয়।
  • একই দিনে বরিশালে ১২ জন ও দুদিন পর ঢাকায় ১৫ জনকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে আটক করা হয়; তাদের দাবি ছিল তাঁরা শেখ হাসিনার জন্মদিনের ঘরোয়া দোয়া করতে বসেছিলেন।
  • HRW-এর অবস্থান: অতীতের সরকারের গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন বর্তমান সরকারের জন্য নতুন করে একই ধরনের লঙ্ঘন করার বৈধতা দিতে পারে না।
০১

ঘটনা কী ঘটেছিল? ২৬ সেপ্টেম্বরের গুলিস্তান

রাজধানী ঢাকার গুলিস্তান—যেখানে রাজনৈতিক সভা ও সমাবেশ দেশের রাজনৈতিক ঐতিহ্যের এক সাধারণ দৃশ্য। ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) জিপিও সংলগ্ন এলাকায় একটি নির্ধারিত সাংগঠনিক সভার আয়োজন করে। প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য অনুযায়ী সভাটি ছিল উন্মুক্ত। কিন্তু সভা চলাকালীন যুবদলের নেতা-কর্মীরা সেখানে উপস্থিত হয়ে পুলিশকে অবহিত করে যে এটি আসলে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের একটি "গোপন বৈঠক"।

পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে অভিযান পরিচালনা করে এবং প্রায় ২৯০ জনকে গণহারে থানায় নিয়ে যায়। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, তাঁদের মধ্য থেকে ২৭ জনকে সরাসরি রিমান্ডে নেওয়া হয় এই অভিযোগে যে তাঁরা ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিচ্ছিলেন। একটি স্বাধীন গণতান্ত্রিক সমাজে স্লোগান বা রাজনৈতিক অভিব্যক্তি কোনো অবস্থাতেই ফৌজদারি অপরাধ হতে পারে না।

২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ঢাকা • গুলিস্তান / জিপিও

জাসদ কার্যালয়/সভা থেকে ২৯০ জন আটক; যুবদলের হস্তক্ষেপে পুলিশি অভিযান। ২৭ জনকে স্লোগানের দায়ে রিমান্ড।

২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬বরিশাল

১২ জন আওয়ামী লীগ সমর্থক আটক—অভিযোগ: ‘নাশকতার গোপন বৈঠক’। তাঁদের বক্তব্য: ঘরোয়া জন্মদিন পালন।

২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ঢাকা

সন্ত্রাসবিরোধী আইন ২০০৯ প্রয়োগ করে ১৫ জনকে গ্রেপ্তার। একই অভিযোগ ও একই টেমপ্লেটে মামলা দায়ের।

“একটি স্লোগানকে কেন্দ্র করে রিমান্ডের আইনি বৈধতা তৈরি করা কোনো আইনের শাসন নয়—এটি ভয়ের সংস্কৃতি জিইয়ে রাখার সনাতন কৌশল।”

— মিনহাজ সামাদ চৌধুরী
০২

প্যাটার্ন: গোপন বৈঠক তত্ত্ব ও সন্ত্রাস আইনের অপব্যবহার

গুলিস্তানের ঘটনাটি কোনো বিচ্ছিন্ন প্রশাসনিক ভুল নয়; বরং এটি একটি সুসংগঠিত রাজনৈতিক প্যাটার্নের ইঙ্গিত দেয়। বরিশাল ও ঢাকার ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মামলাগুলোর বয়ান একই ছকে বাঁধা: ‘গোপন বৈঠক + নাশকতার পরিকল্পনা + সন্ত্রাসবিরোধী আইন’।

২০০৯ সালের সন্ত্রাসবিরোধী আইনটি প্রণীত হয়েছিল সুনির্দিষ্ট সন্ত্রাসী ও জঙ্গিবাদী সহিংসতা মোকাবিলার লক্ষ্যে। কিন্তু যখন ঘরোয়া রাজনৈতিক আলোচনা কিংবা জন্মদিন উদযাপনের মতো নিরীহ জমায়েতকে “সন্ত্রাসী কার্যকলাপের প্রস্তুতি” হিসেবে দেখানো হয়, তখন তা কেবল আইনের অপপ্রয়োগেই সীমাবদ্ধ থাকে না; বিচারিক প্রক্রিয়ার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থাও চূর্ণ করে দেয়।

০৩

ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি — ২০০৯-২০২৪ বনাম ২০২৬

জাসদ ছিল আওয়ামী নেতৃত্বাধীন ১৪-দলীয় জোটের দীর্ঘকালীন রাজনৈতিক শরিক। ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে বিরোধী দল বিএনপি ও জামায়াতের অসংখ্য নেতা-কর্মীকে ঠিক একইভাবে ‘গোপন বৈঠক’ ও ‘নাশকতার ষড়যন্ত্র’ তত্ত্বে বিনা বিচারে কারারুদ্ধ করা হয়েছিল। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অবাধ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বিএনপি যখন ক্ষমতায় আসে, তখন তাদের প্রধান প্রতিশ্রুতি ছিল আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও মানবাধিকারের সুরক্ষা।

২০০৯–২০২৪ মডেল
  • • বিরোধী রাজনৈতিক সভায় পুলিশ ও অঙ্গসংগঠনের হামলা।
  • • সন্ত্রাসবিরোধী ও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ব্যাপক অপব্যবহার।
  • • নির্বিচার আটক ও দীর্ঘ প্রাক-বিচারিক কারাবাস।
২০২৬ মডেল • একই ছায়া
  • • যুবদলের নির্দেশে বামপন্থী ও বিরোধী সভার ওপর পুলিশি রেইড।
  • • স্লোগানকে অপরাধ সাব্যস্ত করে রিমান্ডের আবেদন।
  • • অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রস্তাবিত মানবাধিকার সংস্কার স্থবির।

কিন্তু পদ্ধতি যদি অপরিবর্তিত থাকে এবং কেবল লক্ষ্যবস্তুর পরিবর্তন ঘটে, তবে বুঝতে হবে ক্ষমতার হস্তান্তর হয়েছে ঠিকই, কিন্তু শাসনব্যবস্থার গণতান্ত্রিক রূপান্তর ঘটেনি। তথাকথিত "বিজয়ীর বিচার" (Victor's Justice) কখনোই টেকসই গণতন্ত্র আনতে পারে না।

০৪

মানবাধিকার ও সুশাসনের দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ

একজন জননীতি গবেষক ও মানবাধিকারকর্মী হিসেবে আমি এই সংকটকে ৪টি মৌলিক সাংবিধানিক স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে দেখতে চাই:

১. সমাবেশ ও সংগঠনের স্বাধীনতা

বাংলাদেশ সংবিধানের ৩৭ ও ৩৮ অনুচ্ছেদ নাগরিকের শান্তিপূর্ণ সমাবেশের নিশ্চয়তা দেয়। রাজনৈতিক মতাদর্শ নির্বিশেষে প্রকাশ্য সভা করার অধিকার প্রতিটি নাগরিকের রয়েছে।

২. মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও আনুপাতিকতা

সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদ ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, কোনো স্লোগান যদি সরাসরি সহিংসতায় প্ররোচনা না দেয়, তবে তা অপরাধ হতে পারে না। স্লোগানের কারণে রিমান্ড সংবিধানের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

৩. অ-রাষ্ট্রীয় অভিনেতাদের পুলিশি কর্তৃত্ব

আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা যখন একটি রাজনৈতিক দলের যুব সংগঠনের দাবির প্রেক্ষিতে অভিযান চালায়, তখন রাষ্ট্রের নিরপেক্ষতা ধসে পড়ে এবং পুলিশ পেশাদারিত্ব হারায়।

৪. প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের পশ্চাদপসরণ

অন্তর্বর্তী সরকার নির্বিচার আটক রোধে যেসব সুরক্ষাকবচ প্রস্তাব করেছিল, বর্তমান সরকার সেগুলো পাশ কাটিয়ে পুরনো কর্তৃত্ববাদী পথ বেছে নিয়েছে।

০৫

আন্তর্জাতিক আইনের বাধ্যবাধকতা

বাংলাদেশ জাতিসংঘের International Covenant on Civil and Political Rights (ICCPR) সনদের একটি স্বাক্ষরকারী পক্ষ। এই সনদের ১৯ অনুচ্ছেদ (মতপ্রকাশ), ২১ অনুচ্ছেদ (শান্তিপূর্ণ সমাবেশ) এবং ৯ অনুচ্ছেদ (নির্বিচার আটক নিষিদ্ধকরণ) প্রতিটি সদস্য রাষ্ট্রের জন্য অবশ্যপালনীয় আইনি বাধ্যবাধকতা।

আন্তর্জাতিক আইনে স্পষ্ট বলা হয়েছে: “Past violations by one government cannot justify violations by the next.” অর্থাৎ, অতীতে আওয়ামী লীগের আমলে মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে—এই অজুহাত দেখিয়ে বর্তমান বিএনপি সরকার নিজের দমনমূলক পদক্ষেপের বৈধতা দিতে পারে না।

০৬

পর্যবেক্ষণ ও সুনির্দিষ্ট ৬ দফা সুপারিশ

কোনো বিশেষ রাজনৈতিক দলের পক্ষে বা বিপক্ষে কথা বলছি না। ২০০৯ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত যখন মৌলিক মানবাধিকার হরণ করা হয়েছিল, তখনো সোচ্চার ছিলাম। আজও যখন একই কায়দায় ভিন্ন মতকে স্তব্ধ করা হচ্ছে, আমার অবস্থান একই থাকবে। এই দুষ্টচক্র ভাঙতে হলে সরকারকে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে:

১

সুনির্দিষ্ট অভিযোগহীন বন্দিমুক্তি

যাঁদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কোনো সহিংস কর্মকাণ্ডের প্রমাণ বা ভিডিও ফুটেজ নেই, কেবল স্লোগান বা ঘরোয়া বৈঠকের দায়ে আটক এমন সকল রাজনৈতিক বন্দিকে অবিলম্বে মুক্তি দিতে হবে।

২

দলীয় প্রভাবমুক্ত পেশাদার পুলিশিং

রাজনৈতিক দলের অঙ্গসংগঠনের নির্দেশে পুলিশি রেইড স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ করতে হবে এবং একটি স্বাধীন পুলিশ অভিযোগ কমিশন (Police Complaints Commission) গঠন করতে হবে।

৩

সন্ত্রাসবিরোধী আইনের অপব্যবহার রোধ

রাজনৈতিক সভা বা নিরীহ জমায়েতকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের আওতাভুক্ত করা বন্ধে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ কর্তৃক সুস্পষ্ট সুরক্ষামূলক গাইডলাইন জারি করতে হবে।

৪

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও রিমান্ডের জবাবদিহিতা

রাজনৈতিক স্লোগানের ওপর ভিত্তি করে রিমান্ড মঞ্জুর করার প্রবণতা বন্ধে নিম্ন আদালতের বিচারকদের আইনি মানদণ্ড মেনে চলার কঠোর তদারকি নিশ্চিত করতে হবে।

৫

মানবাধিকার কমিশনের স্বাধীন তদন্ত

গুলিস্তান, ঢাকা ও বরিশালের সাম্প্রতিক গণগ্রেপ্তারের ঘটনাবলীতে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন করে জনসাধারণের সামনে প্রতিবেদন পেশ করতে হবে।

৬

প্রতিশোধ নয়, ন্যায়ের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা

রাজনৈতিক রূপান্তর কেবল ক্ষমতার পরিবর্তন নয়; এটি প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা ও নাগরিকের নির্ভয়ে বাঁচার অধিকার নিশ্চিত করার অঙ্গীকার।

No comments:

Post a Comment

Please validate CAPTCHA