Skip to main content
Breaking NewsDeveloping public-interest story

Latest

Tuesday, October 20, 2026

Reading time

বসতি স্থাপনকারীদের দায়মুক্তি, রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা ও শাসনব্যবস্থার সংকট

 


মানবাধিকার ও আইনের শাসন পর্যবেক্ষণ

আবু ফালাহ-এ সত্যের ওপর আঘাত: বসতি স্থাপনকারীদের দায়মুক্তি, রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা ও শাসনব্যবস্থার সংকট

যখন সশস্ত্র ও মুখোশধারী চরমপন্থী গোষ্ঠী সার্বভৌম বাহিনীর নীরব উপস্থিতিতে আন্তর্জাতিক সাংবাদিকদের ওপর প্রকাশ্যে আক্রমণ চালায়, তখন তা আইনশৃঙ্খলার সাময়িক বিচ্যুতি নয়—বরং রাষ্ট্রীয় নীতি ও কাঠামোগত দায়মুক্তির চরম প্রতিফলন।

দখলকৃত পশ্চিম তীরের খিরবেত আবু ফালাহ গ্রামে ফিলিস্তিনি কৃষকদের প্রজন্মপরম্পরায় টিকে থাকা জলপাই তোলার দৃশ্য ধারণ করছিলেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন আমেরিকান ফটোসাংবাদিক হাইডি লেভিন। ঠিক তখনই একদল মুখোশধারী চরমপন্থী ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারী তার ওপর চড়াও হয়। মাটিতে ফেলে টানা দশ মিনিট ধরে তার পিঠ ও পাঁজরে বুটের লাথি চালানো হয়। বারবার চিৎকার করে নিজের সাংবাদিক পরিচয়পত্র ও মার্কিন নাগরিকত্বের কথা জানানোর পরও আক্রমণকারীরা থামেনি।

রামাল্লার সরকারি হাসপাতালের জরুরি বিভাগে চিকিৎসা নেওয়া হাইডি লেভিনের শরীরে গভীর ক্ষত ও রক্তজমাট বাঁধার আঘাতের বাইরেও তাঁর ব্যক্তিগত ক্যামেরা এবং সবধরনের সরঞ্জাম ছিনতাই করা হয়েছে। তবে এই বর্বরতাকে কেবল একটি বিচ্ছিন্ন হিংস্রতা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। সুশাসন, রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতা এবং আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের (International Humanitarian Law) নিরিখে বিশ্লেষণ করলে এটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, এটি দখলকৃত ভূখণ্ডে আইনের শাসনের পরিকল্পিত বিলুপ্তির একটি স্পষ্ট রূপরেখা।

ওয়েবেরীয় তত্ত্বের লঙ্ঘন: বলপ্রয়োগের একচ্ছত্র অধিকারের বেসরকারীকরণ

রাজনৈতিক দর্শন ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের মূল ভিত্তি হলো ম্যাক্স ওয়েবেরের রাষ্ট্রতত্ত্ব—যেখানে একটি বৈধ রাষ্ট্রকে তার ভৌগোলিক সীমানায় 'বৈধ শারীরিক বলপ্রয়োগের একচ্ছত্র অধিকারী' (Monopoly on the legitimate use of physical force) হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। কিন্তু পশ্চিম তীরে যা ঘটছে, তা সেই মৌলিক শাসনতান্ত্রিক কাঠামোর সম্পূর্ণ বিপরীত।

যখন উগ্রপন্থী আদর্শে পরিচালিত অবৈধ বসতি স্থাপনকারীরা সামরিক কায়দায় সংগঠিত হয়ে বেসামরিক জনগোষ্ঠী ও আন্তর্জাতিক সাংবাদিকদের ওপর সহিংসতা চালায় এবং রাষ্ট্রীয় সশস্ত্র বাহিনী সেখানে নিষ্ক্রিয় দাঁড়িয়ে থাকে—তখন রাষ্ট্র তার প্রাথমিক শাসনতান্ত্রিক শর্ত পূরণে ব্যর্থ হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, হাইডি লেভিনের ওপর হামলার সময় পাশেই কাঁদানে গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড ছোড়া হচ্ছিল, যা ঘটনাস্থলে নিয়মিত বাহিনীর সক্রিয় উপস্থিতিকে নির্দেশ করে। এটি স্পষ্টতই বেসামরিক উগ্রপন্থীদের হাতে রাষ্ট্রীয় বলপ্রয়োগের বেআইনি আউটসোর্সিং—যার লক্ষ্য আন্তর্জাতিক দায় এড়িয়ে স্থানীয়দের উৎখাত করা এবং স্বাধীন পর্যবেক্ষণকে নিশ্চিহ্ন করা।

"হাইডি লেভিনের ওপর এই বর্বরোচিত হামলা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি পশ্চিম তীরে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে চলা ধারাবাহিক সহিংসতা ও নিপীড়নের অংশ... কোনো জবাবদিহিতা না থাকায় হামলাকারীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে।"
— সারা কুদাহ, মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা আঞ্চলিক পরিচালক, কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস (CPJ)

সাক্ষীকে অন্ধ করার কৌশল: সত্যের কণ্ঠরোধ

ফিলিস্তিনের গ্রামীণ জীবনে জলপাই ফসল সংগ্রহ কেবল অর্থনৈতিক ভিত্তি নয়, এটি ভূমির ওপর তাদের ঐতিহাসিক অধিকারের সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রমাণ। আর এই কারণেই এই মৌসুমে গণমাধ্যম ও নিরপেক্ষ আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের উপস্থিতি বসতি স্থাপনকারীদের সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা। কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস (CPJ)-এর তথ্যমতে, ২০২৬ সালেই পশ্চিম তীরে অন্তত ১৬টি ঘটনায় ৩৫ জনেরও বেশি স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক সাংবাদিক হামলার শিকার হয়েছেন।

অক্টোবর ২০২৬: গণমাধ্যম দমনের পরিকল্পিত কালপঞ্জি
  • ৬ অক্টোবর: এএফপি (AFP) আলোকচিত্রী জাফর আশতিয়াহকে রাইফেল বাট দিয়ে পিটিয়ে রক্তাক্ত করে বসতি স্থাপনকারীরা; পাশে থাকা সৈন্যরা কোনো হস্তক্ষেপ করেনি।
  • ৮ অক্টোবর: পর্তুগিজ সাংবাদিক রিকার্দো এস্তেভেস রিবেরোকে সংবাদ সংগ্রহের সময় আটক করে পরদিনই দেশান্তরিত করা হয়।
  • ১০ অক্টোবর: স্পষ্ট "PRESS" চিহ্নিত ভেস্ট পরিহিত থাকা সত্ত্বেও ফিলিস্তিনি ফটোসাংবাদিক ইসাম আল-রিমাউয়িকে লক্ষ্য করে রাবার বুলেট ছোড়ে সেনাবাহিনী।
  • ১৬ অক্টোবর: আবু ফালাহ-এ দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট-এর অ্যাসাইনমেন্টে থাকা হাইডি লেভিনকে নির্মমভাবে পিটিয়ে ক্যামেরা ও যোগাযোগ সামগ্রী লুট করা হয়।

ক্যামেরা কেড়ে নেওয়া, সম্প্রচার বন্ধ করা এবং সাংবাদিকদের শারীরিকভাবে অক্ষম করে তোলার এই চেইন অব কমান্ড আসলে সত্য উন্মোচনের সুযোগ রুদ্ধ করার কাঠামোগত কৌশল। যেখানে নিরপেক্ষ কোনো ক্যামেরা থাকবে না, সেখানে অধিকার লঙ্ঘনের কোনো প্রমাণও আন্তর্জাতিক মহলে পৌঁছাবে না।

অভ্যন্তরীণ তদন্তের প্রহসন এবং জেনেভা কনভেনশন

ঘটনার পর ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে "তদন্ত চলছে" এবং "তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে"—জাতীয় চিরাচরিত আমলাতান্ত্রিক বক্তব্য দেওয়া হয়েছে। তবে শাসনব্যবস্থার অতীত উপাত্ত প্রমাণ করে, চরমপন্থী বসতি স্থাপনকারীদের বিরুদ্ধে এমন শত শত সামরিক বা পুলিশি তদন্তের সিংহভাগই কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ ছাড়াই বন্ধ করে দেওয়া হয়।

বিচারহীনতার এই প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি আন্তর্জাতিক আইনের সরাসরি বরখেলাপ। জেনেভা কনভেনশনের অতিরিক্ত প্রটোকল-১-এর অনুচ্ছেদ ৭৯ (Article 79 of Additional Protocol I) এবং জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের রেজল্যুশন ২২২২ (UNSC Res 2222) অনুসারে, যুদ্ধকবলিত ও সামরিকভাবে দখলকৃত ভূখণ্ডে কর্মরত সাংবাদিকদের পূর্ণ বেসামরিক নাগরিকের মর্যাদা এবং বিশেষ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সংশ্লিষ্ট দখলদার কর্তৃপক্ষের আইনি বাধ্যবাধকতা। সাংবাদিকদের সুরক্ষায় ব্যর্থ হওয়া এবং হামলাকারীদের প্রশাসনিক নিরাপত্তা প্রদান আন্তর্জাতিক অপরাধের শামিল।



দায়মুক্তি অবসানে নীতিনির্ধারণী সুপারিশ

আন্তর্জাতিক মহলের প্রথাগত কূটনৈতিক "উদ্বেগ প্রকাশ" চরমপন্থীদের জন্য কোনো প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেনি। মানবাধিকারের সুরক্ষা ও কার্যকর বৈশ্বিক শাসন নিশ্চিতে অবিলম্বে তিনটি সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি:

  1. সশস্ত্র চরমপন্থী নেটওয়ার্কের ওপর লক্ষ্যভিত্তিক নিষেধাজ্ঞা: কেবল পৃথক কয়েকজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে নয়, বরং আন্তর্জাতিক সীমানা লঙ্ঘনকারী চরমপন্থী বসতি স্থাপনকারী আউটপোস্ট এবং তাদের আর্থিক মদতদাতা নেটওয়ার্কের ওপর কঠোর বৈশ্বিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে হবে।
  2. জাতিসংঘের মাধ্যমে স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত: যেহেতু অভ্যন্তরীণ সামরিক ব্যবস্থা জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে কাঠামোগতভাবে ব্যর্থ, তাই গণমাধ্যমের ওপর হামলার তদন্তে জাতিসংঘের স্বাধীন তদন্ত কমিশনকে (UN Independent Commission of Inquiry) নিরপেক্ষ তদন্তের ম্যান্ডেট দিতে হবে।
  3. দ্বিপাক্ষিক সহায়তার শর্তারোপ: পশ্চিমা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোকে তাদের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সহায়তার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক আইনের বাস্তবায়ন এবং সাংবাদিকদের সুরক্ষাকে বাধ্যতামূলক শর্ত হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।

যখন প্রেস পাস বহনকারী একজন জ্যেষ্ঠ আন্তর্জাতিক সাংবাদিককে খোদ দিবালোকে দশ মিনিট ধরে বুট দিয়ে পিষে ফেলা যায়, তখন স্থানীয় ফিলিস্তিনিদের বেঁচে থাকার ন্যূনতম নিরাপত্তা কোথায়—সেই প্রশ্নটি অবধারিত হয়ে দাঁড়ায়। বিচারহীনতার এই সংস্কৃতি যদি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এখনই প্রতিহত করতে না পারে, তবে তা সার্বজনীন মানবাধিকার সনদের মৌলিক ভিত্তিকে ধূলিসাৎ করে দেবে।

লেখক পরিচিতি

মিনহাজ সামাদ চৌধুরী একজন স্বাধীন মানবাধিকার সংরক্ষক, সুশাসন ও জননীতি বিশ্লেষক। তিনি প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা, আন্তর্জাতিক মানবিক আইন, নাগরিক স্বাধীনতা এবং গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার সুরক্ষা নিয়ে নীতি-বিশ্লেষণমূলক কাজ করে যাচ্ছেন।

No comments:

Post a Comment

Please validate CAPTCHA